বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

সত্যিই কি আল্লাহ কাউকে ভুলে যান?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম

সত্যিই কি আল্লাহ কাউকে ভুলে যান?

আধুনিক জীবনের জটিলতা, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো বিপদের মুখোমুখি হলে মানুষের মনে একটি চরম হতাশাজনক প্রশ্ন উঁকি দেওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। অনেক সময় মানুষ ভাবতে শুরু করে যে, এই বিশাল মহাবিশ্বের স্রষ্টা হয়তো তার কথা ভুলে গেছেন। চারপাশের পরিস্থিতি যখন ক্রমাগত প্রতিকূল হতে থাকে, তখন এই মানসিক শূন্যতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু ইসলামি ধর্মতত্ত্ব এবং কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্য অনুযায়ী, স্রষ্টার ভুলে যাওয়ার ধারণাটি কেবল মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা থেকে তৈরি একটি বিভ্রান্তি। স্রষ্টার সত্তার সাথে বিস্মৃতির কোনো সম্পর্ক নেই। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহর জ্ঞান এবং স্মরণ সব সময় নিখুঁত।

এই বিষয়ের সবচেয়ে সরাসরি উত্তর পাওয়া যায় সূরা মারইয়ামের ৬৪ নম্বর আয়াতে, যেখানে বলা হয়েছে, "আপনার রব কখনো বিস্মৃতিপ্রবণ নন।" অর্থাৎ, ভুলে যাওয়া স্রষ্টার কোনো গুণ বা স্বভাবের অংশ নয়। একই কথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় সূরা ত্বাহার ৫২ নম্বর আয়াতে। সেখানে হযরত মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের সামনে দাঁড়িয়ে স্রষ্টার পরিচয় দিচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, "আমার রব কখনো ভুল করেন না এবং তিনি ভুলেও যান না।" ইসলামি পণ্ডিত এবং ব্যাখ্যাকারীদের মতে, এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা থেকে শুরু করে মানুষের মনের গভীরতম গোপন কথাও স্রষ্টার সার্বক্ষণিক জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। মানুষের জাগতিক সময় বা স্থানের দূরত্ব আল্লাহর স্মরণকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না।

তবে কুরআনের কিছু জায়গায় ‍‍`ভুলে যাওয়া‍‍` শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা অনেক সময় সাধারণ পাঠকদের মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আত-তাওবার ৬৭ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, "তারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন।" এই আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসীর উল্লেখ করেছেন যে, এখানে ‍‍`ভুলে যাওয়া‍‍` মানে স্রষ্টার স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো, ওই ব্যক্তিরা যখন স্বেচ্ছায় স্রষ্টার নির্দেশ অমান্য করে এবং তাঁকে স্মরণ করা থেকে বিরত থাকে, তখন আল্লাহও তাদের ওপর থেকে তাঁর বিশেষ রহমত ও সাহায্য তুলে নেন। এটি মূলত মানুষের কর্মের একটি ন্যায়সঙ্গত প্রতিফল, কোনোভাবেই স্রষ্টার মানসিক অক্ষমতা নয়।

ঐতিহাসিকভাবে, খোদ ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে এমন একটি পর্যায় এসেছিল যখন তিনি তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওহী বা ঐশী বাণী আসার ধারা যখন কিছুদিন বন্ধ ছিল, তখন মক্কার অবিশ্বাসীরা তাকে উপহাস করে বলতে শুরু করেছিল যে, তার রব তাকে ত্যাগ করেছেন এবং ভুলে গেছেন। এই সাময়িক নীরবতা নবীকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছিল। ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে অবতীর্ণ হয় সূরা আদ-দোহা। এই সূরায় আল্লাহ অত্যন্ত মমতার সাথে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, "আপনার রব আপনাকে কখনো ত্যাগ করেননি এবং তিনি আপনার প্রতি অসন্তুষ্টও হননি।" এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নীরবতা বা সাময়িক বিপদ মানেই স্রষ্টার বিস্মৃতি নয়। কখনো কখনো এটি মানুষের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া মাত্র।

মানুষ কেন মনে করে যে আল্লাহ তাকে ভুলে গেছেন, এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোও ইসলামি দর্শনে গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। মানুষ মূলত ফলাফল কেন্দ্রিক। তারা যখন কোনো নির্দিষ্ট চাওয়া নিয়ে প্রার্থনা করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে তার উত্তর পায় না, তখন তারা হতাশায় ভোগে। কিন্তু ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রার্থনার উত্তর না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে স্রষ্টা তা শুনতে পাননি বা ভুলে গেছেন। বরং, স্রষ্টা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এবং উপায় নির্ধারণ করে রাখেন। কখনো কখনো তিনি মানুষের কাঙ্ক্ষিত বস্তু না দিয়ে তাকে বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করেন, আবার কখনো সেই প্রার্থনার প্রতিদান পরকালের জন্য সঞ্চিত রাখেন। মানুষের সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে স্রষ্টার এই বিশাল পরিকল্পনা সবসময় বোঝা সম্ভব হয় না।

স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যকার এই সম্পর্কটি মূলত একটি পারস্পরিক স্মরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সূরা আল-বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ একটি সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, "তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।" বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ সহীহ বুখারীতে একটি হাদিসে কুদসি রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ বলেন—আমি আমার বান্দার সাথে তেমনই আচরণ করি, যেমন সে আমার সম্পর্কে ধারণা রাখে। যখন সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমি তাকে আমার মনে স্মরণ করি। এই বর্ণনাগুলো অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, মানুষের সাথে স্রষ্টার সংযোগ একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া। মানুষ যখন বিপদের সময় স্রষ্টাকে স্মরণ করে, তখন সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্রষ্টার বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।

জীবনের চরম কঠিন মুহূর্তে যখন মনে হয় চারপাশের সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন এই বিশ্বাস মানুষকে অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তি জোগায়। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে, একজন মুমিন কখনোই বিশ্বাস করে না যে সে এই বিশাল পৃথিবীতে একা বা পরিত্যক্ত। গাছ থেকে ঝরে পড়া একটি সাধারণ পাতাও যেমন স্রষ্টার জ্ঞানের বাইরে নয়, তেমনি একজন মানুষের নীরব কান্না বা অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাসও তাঁর অজানা নয়। বিপদের সময় নীরবতা মানে ভুলে যাওয়া নয়, বরং এটি এক গভীরতর পরীক্ষার অংশ। মানুষ যখন এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারে, তখন তার জীবন থেকে হতাশা দূর হয় এবং সে এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করে।

banner
Link copied!