পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির ঐতিহাসিক জয়ের পর রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন বলে পুলিশ ও দলীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই কলকাতার বেলেঘাটা ও নিউ টাউনসহ হাওড়া ও বীরভূমে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুইজন বিজেপির এবং দুইজন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এদিকে তিন মেয়াদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আসনে পরাজিত হওয়ার পর নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০টিতে। এনডিটিভি জানিয়েছে, খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত হয়েছেন। তবে এই ম্যান্ডেটকে লুণ্ঠিত ম্যান্ডেট হিসেবে আখ্যায়িত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন যে তিনি এই ফলাফল মেনে নিচ্ছেন না এবং অন্তত ১০০টি আসনে কারচুপি হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সহিংসতার ঘটনায় নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কলকাতার বেলেঘাটায় তৃণমূল কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়কের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। অন্যদিকে নিউ টাউনে বিজয় মিছিল চলাকালীন সংঘর্ষে মধু মন্ডল নামে এক বিজেপি কর্মী নিহত হন। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বিজয় উল্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে লিন্ড করার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি কর্মী যাদব বাড়ের বিরুদ্ধে। বীরভূমের নানুরে তৃণমূল কর্মী আবির শেখকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় বিজেপি কর্মীদের দায়ী করেছে তার পরিবার। দি হিন্দু জানিয়েছে, এসব ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব ও পুলিশ প্রধানকে সংবেদনশীল এলাকায় টহল বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজ্যে মোতায়েন করা ২৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে ৭০০ কোম্পানিকে এখনো রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে বিজেপি নেতৃত্ব এসব সহিংসতার জন্য তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্বকে দায়ী করেছে। বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা দাবি করেছেন যে পরিস্থিতি ২০২১ সালের মতো অতটা ভয়াবহ নয় এবং পুলিশ এখন অনেক বেশি তৎপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথম বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায় আসছে যা রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য কমে যাওয়া এবং ভোট ভাগাভাগি বিজেপির জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে বাংলায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আনতে হবে এবং কোনো ধরনের প্রতিহিংসা বরদাশত করা হবে হবে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগে অস্বীকৃতি রাজ্যে একটি সাংবিধানিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।
