বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

মার্কিন-ইরান যুদ্ধে নতুন মোড়: শেষ হলো ‍‍`এপিক ফিউরি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

মার্কিন-ইরান যুদ্ধে নতুন মোড়: শেষ হলো ‍‍`এপিক ফিউরি

দীর্ঘ কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধে বড় ধরনের মোড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার ঘোষণা করেছেন যে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান বিরোধী আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান ‍‍`অপারেশন এপিক ফিউরি‍‍` আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, অভিযানের লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়েছে এবং এখন তারা সামরিক শক্তির বদলে কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিতে চায়।

একই দিনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‍‍`ট্রুথ সোশ্যাল‍‍`-এ জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু করা ‍‍`প্রজেক্ট ফ্রিডম‍‍` সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তান এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর অনুরোধের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইরানের সাথে একটি ‍‍`পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির‍‍` পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও এই অগ্রগতির কথা নিশ্চিত করেছেন এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানের দীর্ঘদিনের একটি দাবিতে নমনীয় হয়েছে। তেহরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে, যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্যিক পথ উন্মুক্ত করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরে হবে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন জেদ ধরেছিল যে, যেকোনো চুক্তির কেন্দ্রে থাকতে হবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের বিষয়টি। তবে বর্তমান সংকেতগুলো বলছে, একটি সংক্ষিপ্ত ‍‍`মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং‍‍` (MoU) বা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আগে যুদ্ধ থামানোর পথে এগোচ্ছে দুই পক্ষ।

এই কূটনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে কিছু তিক্ত বাস্তবতাও কাজ করছে। গত কয়েক দিনে যুদ্ধবিরতি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। সোমবার এবং মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, যাতে তিনজন ভারতীয় শ্রমিক আহত হয়েছেন। যদিও ইরান এই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে, তবে একে মার্কিন ও মিত্রদের ওপর চাপের কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অবশ্য জানিয়েছেন যে, এই ছোটখাটো ঘটনাগুলো বড় ধরনের যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেনি।

তেহরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সৈয়দ মোজতবা জালালজাদেহ আল জাজিরাকে বলেছেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে যে ইরানের ওপর সামরিক চাপ দিয়ে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। তিনি মনে করেন, একটি সমঝোতা স্মারকের দিকে এগিয়ে যাওয়া সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগও একমত পোষণ করেছেন যে, ওয়াশিংটন মেনে নিয়েছে যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালী এবং পারমাণবিক ইস্যু — এই সব কিছু একসাথে সমাধান করা বর্তমানে সম্ভব নয়।

বর্তমানে পাকিস্তান ও সৌদি আরব এই শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধান ভূমিকা পালন করছে। ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে গোপন আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১৪ দফা প্রস্তাবে যুদ্ধের ৩০ দিনের মধ্যে সমাপ্তি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং বাজেয়াপ্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। যদিও পারমাণবিক ইস্যুটি এখনও আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে, তবে মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি আলোচনার টেবিলে তোলা হবে। বিশ্ব এখন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির চূড়ান্ত রূপ দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।

banner
Link copied!