যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টলে অবস্থিত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের একটি কারখানায় হামলার ঘটনায় চারজন ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ব্রিটিশ আদালত। মঙ্গলবার লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্ট এই রায় ঘোষণা করে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছিল। অপরাধমূলক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগে এই চারজনকে সাজা দেওয়া হলেও, প্রমাণের অভাবে অপর দুইজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথিপত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হওয়া চারজন হলেন ৩০ বছর বয়সী শার্লট হেড, ২৩ বছর বয়সী স্যামুয়েল কর্নার, ৩০ বছর বয়সী লিওনা কামিও এবং ২১ বছর বয়সী ফাতিমা জয়নাব রাজওয়ানি। অন্যদিকে, ২২ বছর বয়সী জোয়ি রজার্স এবং ৩১ বছর বয়সী জর্ডান ডেভলিনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন `প্যালেস্টাইন অ্যাকশন`-এর সদস্য হিসেবে এই ছয়জন সরাসরি এলবিট সিস্টেমসের গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছিলেন বলে সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতে দাবি করেন।
এই বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্যামুয়েল কর্নারের বিরুদ্ধে আনা গুরুতর অভিযোগটি। প্রসিকিউটরদের তথ্যমতে, ব্রিস্টলের ফিলটনে অবস্থিত ওই স্থাপনায় অভিযানের সময় কর্নার একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে স্লেজহ্যামার বা ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। এই কারণে তাকে অপরাধমূলক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর শারীরিক আঘাত করার দায়েও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। ব্রিস্টলের ওই হামলায় কারখানার ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় দশ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আসামিরা কারখানার ভেতরে সামরিক ড্রোন এবং সরঞ্জাম ভাঙচুরের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে নেন। তবে তাদের আইনজীবীদের মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ফিলিস্তিনে নিরীহ মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদেই তারা ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংসের এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জোর দিয়ে বলেন, এই কর্মীরা মাথা উঁচু করে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের এই পদক্ষেপের কারণে ফিলিস্তিনে অন্তত কিছু প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
আইনি লড়াইয়ের এই পথটি বেশ দীর্ঘ ছিল। এর আগে অনুষ্ঠিত একটি বিচারে এই ছয়জন আসামির সবাইকেই পরিকল্পিত চুরির (অ্যাগ্রাভেটেড বার্গ্লারি) অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছিল। সে সময় জুরি বোর্ড অপরাধমূলক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনা সহিংস বিশৃঙ্খলার অভিযোগও প্রত্যাহার করে নেয়। তবে সর্বশেষ বিচারে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে চারজনকে সাজা দেওয়া হলো।
ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাজ্যের অস্ত্র ব্যবসার বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরেই সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন। এই গোষ্ঠীর দাবি, এলবিট সিস্টেমস ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ড্রোন ও প্রযুক্তি সরবরাহ করে, যা গাজায় সাধারণ মানুষের ওপর ব্যবহার করা হচ্ছে। কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এলবিট সিস্টেমস প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার আয়ের একটি বিশাল বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ হাজার কর্মী কাজ করেন।
যুক্তরাজ্য সরকার গত জুলাই মাসে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসবাদ আইনের আওতায় একটি নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের একটি বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে সংগঠনটির কর্মীদের অনুপ্রবেশের কয়েকদিন পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে লন্ডনের হাইকোর্ট সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিলেন, তবে সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করায় সংগঠনটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল রয়েছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, এই আপিলের শুনানি গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
