সুদানের রাজধানী খার্তুমের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ড্রোন হামলার পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সরাসরি দায়ী করেছে সুদান সরকার। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার ইথিওপিয়া থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে খার্তুম। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আগ্রাসনের জবাব নিরবে মেনে নেওয়া হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে সুদানের সামরিক বাহিনী। এই হামলার জেরে খার্তুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম টানা তিন দিনের জন্য স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সুদানের সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা প্রমাণ রয়েছে যে গত মার্চের শুরু থেকে ইথিওপিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে সুদানের ওপর অন্তত চারটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, এই হামলায় ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ড্রোনগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাত সরবরাহ করেছে। খার্তুম বিমানবন্দরের এই হামলা চলমান স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টায় একটি বড় আঘাত। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই যুদ্ধবিধ্বস্ত এই বিমানবন্দরে দীর্ঘ বিরতির পর প্রথম কোনো যাত্রীবাহী ফ্লাইট অবতরণ করেছিল। শহরটিতে সাময়িক স্বস্তির যে ইঙ্গিত তৈরি হয়েছিল, নতুন এই আকাশপথের হামলায় তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
সুদানের এই অভিযোগের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইথিওপিয়া। আদ্দিস আবাবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। উল্টো তারা অভিযোগ করেছে যে, সুদান সরকার ইথিওপিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফ-কে অর্থায়ন করে দেশটিতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের মধ্যে `ঐতিহাসিক এবং স্থায়ী বন্ধুত্বের বন্ধন` থাকার কারণেই তারা নিজেদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো আগে জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। তবে টিপিএলএফ-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইমানুয়েল আসেফা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুদানের সাথে তাদের কোনো রকম সংযোগ থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইথিওপিয়া সরকার নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সবার ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সাম্প্রতিক এই ড্রোন হামলার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে আবু ধাবি আগে থেকেই সুদানের আধাসামরিক গোষ্ঠী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ-কে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এসএএফ এবং এই আরএসএফ-এর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই ক্ষমতার লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত দেড় লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট, যার ফলে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত বছরের মার্চ মাসে আরএসএফ-এর হাত থেকে খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছিল সেনাবাহিনী। এরপর প্রায় ১৮ লাখ মানুষ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই শহরে ফিরে এলেও তাদের বেশিরভাগই বিদ্যুৎ বা মৌলিক সেবা ছাড়াই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ বা আইসিজি-এর হর্ন অব আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক অ্যালান বসওয়েল আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নতুন পর্যায় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, সুদান এবং ইথিওপিয়া উভয় দেশই নিজেদের চরম অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এখন তারা একে অপরকে তাদের সশস্ত্র বিরোধীদের সমর্থক হিসেবে সন্দেহ করছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস পুরো হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। বসওয়েল আরও উল্লেখ করেন, বিদেশী সমর্থন এবং ড্রোনসহ অন্যান্য অস্ত্র সরবরাহ ছাড়া সুদানের এই দুই বিবদমান পক্ষ অনেক আগেই গোলাবারুদ শূন্য হয়ে পড়ত। এই ধরনের নজিরবিহীন আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ পুরো মহাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে।
