বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

বেইজিংয়ে আরাগচি: মার্কিন-ইরান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টায় চীন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

বেইজিংয়ে আরাগচি: মার্কিন-ইরান যুদ্ধ থামানোর চেষ্টায় চীন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে একটি কার্যকর শান্তিচুক্তির আলোচনা যখন গতি পাচ্ছে, ঠিক তখনই বেইজিং সফর করছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বুধবার তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। আল জাজিরা ও হংকং-ভিত্তিক ফিনিক্স টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী জোরপূর্বক খুলে দেওয়ার মার্কিন সামরিক উদ্যোগ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরপরই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফরের সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ মার্কিন-ইরান যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে।

বৈঠকের শুরুতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সুস্পষ্টভাবে একটি ব্যাপক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। ফিনিক্স টিভির সম্প্রচারিত ফুটেজ অনুযায়ী, তিনি আরাগচিকে বলেন যে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে আর কোনো বিলম্ব করা উচিত নয় এবং নতুন করে সংঘাত শুরু করা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সবচেয়ে জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যাতে তারা হরমুজ প্রণালীর অবরোধ শিথিল করতে তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা একে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনীতে পরিণত করেছে।

কৌশলগত এই সামুদ্রিক পথ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা বেশ কিছুদিন ধরেই চরমে অবস্থান করছে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। অন্যদিকে, এপ্রিলে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করতে ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর পাল্টা সামরিক অবরোধ আরোপ করে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দ্বিমুখী অবরোধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ায় উপসাগরীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় চীনও এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব অনুভব করছে। একই সঙ্গে, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণেই বেইজিং এখন উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছে।

পুরো সংঘাতের সময়জুড়ে চীন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আহ্বানের পাশাপাশি মার্কিন নীতির সমালোচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, বুধবারের বৈঠকে ওয়াং ই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপকে আবারও অবৈধ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বেইজিং বারবার এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, ইরানের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে তারা পুরোপুরি সমর্থন করেনি। তবে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে চীন একটি বিপজ্জনক উস্কানি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বিশ্ব রাজনীতিকে জঙ্গলের আইনে ফিরিয়ে নিতে পারে বলে সতর্ক করেছে। এছাড়া, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর পশ্চিমা প্রচেষ্টায় রাশিয়ার পাশাপাশি চীনও সরাসরি ভেটো প্রদান করে।

তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান চাপ চীন বরাবরই কৌশলগত কারণে উপেক্ষা করে এসেছে। ইরানি তেল কেনার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি চীনা কোম্পানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, বেইজিং তাদের কোম্পানিগুলোকে এই একতরফা নিষেধাজ্ঞা মানতে নিষেধ করেছে। এতকিছুর পরও, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি প্রকাশ্যে চীনের প্রতি সংকট নিরসনে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি গত বছরের শেষ দিকে পৌঁছানো প্রাথমিক বাণিজ্য চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেয়। বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির গবেষক জোডি ওয়েন আল জাজিরাকে বলেন, চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীর আশপাশে আরও অস্থিতিশীলতা রোধ করা। ওয়েন মনে করেন, চীন তার কূটনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং হরমুজ প্রণালীকে আগের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে।

banner
Link copied!