আধুনিক যুগের চরম ব্যস্ততা এবং প্রযুক্তির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মধ্যে মানুষের মন প্রতিনিয়ত বিক্ষিপ্ত হচ্ছে। জাগতিক চাওয়া-পাওয়া, ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড় এবং বিনোদনের অন্তহীন উৎসের ভিড়ে মানুষ তার মূল আধ্যাত্মিক সংযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সাধারণ দৃষ্টিতে এটিকে কেবল সময় ব্যবস্থাপনা বা মানসিক ক্লান্তির ফলাফল বলে মনে হতে পারে। তবে ইসলামি ধর্মতত্ত্ব এই বিক্ষিপ্ততার একটি গভীরতর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক কারণ নির্দেশ করে। কুরআন এবং হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের মনকে তার স্রষ্টার স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই নিরন্তর প্রক্রিয়াটি মূলত শয়তানের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। শয়তান কোনো দৃশ্যমান শক্তি প্রয়োগ করে নয়, বরং অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির মাধ্যমে মানুষকে তার জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে গাফেল করে দেয়।
কুরআনের সূরা আল-মুজাদালার ১৯ নম্বর আয়াতে শয়তানের এই প্রভাবের কথা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে শয়তান তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে শয়তানের প্রাথমিক লক্ষ্য মানুষকে সরাসরি বড় কোনো অপরাধে লিপ্ত করা নয়, বরং প্রথম ধাপে স্রষ্টার স্মরণ বা জিকির থেকে তার মনকে সরিয়ে নেওয়া। একবার যখন মানুষের মন থেকে স্রষ্টার সচেতনতা দূর হয়ে যায়, তখন তাকে যেকোনো অনৈতিক বা ক্ষতিকর কাজের দিকে পরিচালিত করা অত্যন্ত সহজ হয়ে ওঠে। ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, এই ভুলিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ঘটে ধাপে ধাপে, মানুষের প্রাত্যহিক চিন্তা ও উদ্বেগের সুযোগ নিয়ে।
শয়তানের এই আক্রমণের ধরন সম্পর্কে সূরা আল-আরাফের ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে। বিতাড়িত হওয়ার পর শয়তান স্রষ্টার কাছে শপথ করে বলেছিল যে সে মানুষের সামনে, পেছনে, ডান এবং বাম দিক থেকে আক্রমণ করবে। এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, ডান দিক থেকে আক্রমণের অর্থ হলো মানুষকে তার ইবাদত ও সৎকাজে বাধা দেওয়া বা সেখানে রিয়া তথা লোকদেখানো মনোভাব তৈরি করা। বাম দিক থেকে আক্রমণের অর্থ হলো পাপকাজকে আকর্ষণীয় করে তোলা। সামনের দিক থেকে আক্রমণ মানে পরকাল সম্পর্কে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করা এবং পেছনের দিক থেকে আক্রমণ বলতে দুনিয়ার মোহ এবং সম্পদের প্রতি প্রবল আসক্তি সৃষ্টি করাকে বোঝায়। এই চতুর্মুখী মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে স্রষ্টার স্মরণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
মানুষ যখন ইবাদতের মতো পবিত্রতম কাজের জন্য দাঁড়ায়, তখনও শয়তান তাকে ছেড়ে দেয় না। সহীহ মুসলিমের একটি বিখ্যাত বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি উসমান ইবনে আবুল আস (রা.) একবার নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করেন যে শয়তান তার নামাজ এবং কেরাতের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। নবী (সা.) তাকে জানান যে এটি `খিনজাব` নামক এক বিশেষ শয়তানের কাজ, যার একমাত্র দায়িত্ব হলো নামাজরত ব্যক্তির মনে দুনিয়াবি চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটানো। মানুষ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন এই শয়তান তাকে এমন সব জাগতিক বিষয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা সে নামাজের আগে সম্পূর্ণ ভুলে ছিল। এর ফলে ব্যক্তি শারীরিকভাবে ইবাদতে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে সে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। এটি শয়তানের অন্যতম সফল একটি কৌশল।
জাগতিক চিন্তা এবং ভবিষ্যতের অহেতুক ভয় দেখিয়ে মানুষকে স্রষ্টার স্মরণ থেকে দূরে রাখাও শয়তানের একটি বড় হাতিয়ার। সূরা আল-বাকারার ২৬৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানান যে শয়তান মানুষকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। যখন মানুষ তার ভবিষ্যৎ, রিজিক বা সম্পদ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভোগে, তখন তার মন থেকে আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল দূর হয়ে যায়। সে মনে করতে শুরু করে যে তার নিজের বুদ্ধি ও চাতুর্যই তাকে রক্ষা করবে। এই অতিরিক্ত জাগতিক উদ্বেগ মানুষকে আধ্যাত্মিক চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সে উপার্জনের পেছনে এতটা মরিয়া হয়ে ওঠে যে, হালাল ও হারামের সীমানা ভুলে যায় এবং দৈনিক ইবাদতের সময়গুলো অবলীলায় নষ্ট করে ফেলে।
মানুষের প্রাত্যহিক রুটিন, বিশেষ করে ঘুমের সময়টিতেও শয়তানের প্রভাবের কথা হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সহীহ আল-বুখারীর একটি বর্ণনায় নবী মুহাম্মদ (সা.) জানিয়েছেন, মানুষ যখন ঘুমায় তখন শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিরা বা বাঁধন দেয়। প্রতিটি বাঁধন দেওয়ার সময় সে ফিসফিস করে বলে যে, রাত এখনো অনেক দীর্ঘ, তুমি ঘুমাও। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে ফজর বা ভোরের ইবাদত থেকে বিরত রাখা এবং তার দিনটি অলসতার সাথে শুরু করা। যদি ব্যক্তি জেগে উঠে আল্লাহর স্মরণ করে, তবে একটি বাঁধন খুলে যায়। ওজু করলে দ্বিতীয়টি এবং নামাজ আদায় করলে তৃতীয় বাঁধনটি খুলে যায়। ফলে সে সকালটি প্রাণবন্ত ও পবিত্র মনে শুরু করতে পারে। অন্যথায়, তার সকাল শুরু হয় বিষণ্ণতা ও অলসতা দিয়ে, যা সারাদিন তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল রাখতে সাহায্য করে।
আধুনিক যুগে প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো শয়তানের এই `গাফেল` করার প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করা, অপরের জীবনের সাথে নিজের তুলনা করা এবং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজের একটি মেকি পরিচয় দাঁড় করানোর চেষ্টায় মানুষের অমূল্য সময় নষ্ট হচ্ছে। এই অন্তহীন বিনোদন মানুষকে এমন এক ঘোরের মধ্যে রাখে যেখানে মৃত্যু, পরকাল এবং স্রষ্টার সামনে দাঁড়ানোর চিন্তার কোনো অবকাশ থাকে না। সাময়িক আনন্দের এই ঘোর মূলত মনস্তাত্ত্বিক ওয়াসওয়াসা বা প্ররোচনা, যা মানুষকে তার জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
কুরআন এই বিক্ষিপ্ততার একটি শক্তিশালী প্রতিষেধকও প্রদান করেছে। সূরা আর-রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, একমাত্র আল্লাহর স্মরণেই মানুষের অন্তর প্রকৃত প্রশান্তি লাভ করে। ইসলামি দর্শন অনুযায়ী, শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সচেতনভাবে ও নিয়মিত আল্লাহর স্মরণ বা জিকির চালু রাখা। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে তার ভেতরের অযৌক্তিক উদ্বেগ, ভয় বা শূন্যতা মূলত শয়তানের ধোঁকা, তখন সে দ্রুত স্রষ্টার দিকে ফিরে আসে। দৈনন্দিন জীবনে ক্ষমা প্রার্থনা করা, কোরআন অধ্যয়ন করা এবং নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে প্রশ্রয় না দেওয়াই হলো এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
