বৃহস্পতিবার, ০৭ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩

ইসলামে অসহায়কে দান করার অশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৬, ২০২৬, ১১:১০ পিএম

ইসলামে অসহায়কে দান করার অশেষ ফজিলত ও গুরুত্ব

ইসলাম কেবল একটি ধর্মের নাম নয় বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান যা মানবতার সেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে। পবিত্র ইসলাম ধর্মে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করাকে ইবাদতের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একজন মুমিনের জীবনে দানশীলতা বা সদকা কেবল সামাজিক কোনো সেবামূলক কাজ নয় বরং এটি পরকালীন জীবনের জন্য এক বিশেষ সঞ্চয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বারবার মুমিনদের সম্পদ ব্যয়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অসহায়কে দান করার মাধ্যমে আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের কথা বলেছেন।

পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুযায়ী দানশীল ব্যক্তির মর্যাদা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন যে যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে তাদের উপমা হলো একটি শস্যবীজের মতো যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রতিটি শীষে থাকে ১০০টি দানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন (সূরা আল-বাকারা, ২:২৬১)। এই আয়াতটি আমাদের স্পষ্ট করে দেয় যে দান করলে সম্পদ কমে না বরং তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ইসলামি আইনবিদরা মনে করেন দান করার মাধ্যমে সম্পদের বরকত বৃদ্ধি পায় এবং দাতা অনেক ধরনের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পান। একই সঙ্গে দানশীলতা মানুষের ভেতরের অহংকার ও কৃপণতা দূর করে তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

হাদিস শরিফেও অসহায় ও বিপন্ন মানুষের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির উচ্চ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন যে সম্পদ দান করলে কখনো কমে না এবং কোনো বান্দা যখন ক্ষমা করে দেয় তখন আল্লাহ তার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে দেন (সহীহ মুসলিম, ২৫৮৮)। এই ঘোষণার মাধ্যমে মহানবী (সা.) মুসলিম উম্মাহকে অন্যের তরে নিজের সম্পদ ও শ্রম ব্যয়ে উৎসাহিত করেছেন। বিশেষ করে বিধবা, এতিম এবং নিঃস্ব মানুষের দেখভাল করাকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার সমতুল্য পুণ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন যে দাতা ব্যক্তি আল্লাহর নিকটতম, জান্নাতের নিকটতম এবং মানুষের নিকটতম থাকে কিন্তু জাহান্নাম থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।

অসহায়কে দান করার অন্যতম বড় ফজিলত হলো এটি কবরের আজাব ও কিয়ামতের ভয়াবহ উত্তাপ থেকে রক্ষা করে। হাদিস শরিফে এসেছে যে দান-সদকা পাপকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয় যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে (তিরমিযী, ২৬১৬)। কিয়ামতের সেই কঠিন দিনে যখন সূর্যের উত্তাপে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে তখন দাতা ব্যক্তি তার দানকৃত মালের ছায়ার নিচে অবস্থান করবে। এটি কেবল পরকালীন মুক্তি নয় বরং ইহকালীন জীবনেও মানুষের মনে এক অনাবিল প্রশান্তি বয়ে আনে। যখন একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি তার পাশের অসহায় প্রতিবেশী বা অপরিচিত কোনো বিপন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটায় তখন তার অন্তরে যে বিশেষ আনন্দ অনুভূত হয় তাকে ইসলামের ভাষায় ‍‍`সকিনা‍‍` বা আত্মিক শান্তি বলা হয়।

সামাজিক সাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ইসলামের এই দান পদ্ধতি অনন্য ভূমিকা পালন করে। যাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদ যখন ধনীদের হাতে কুক্ষিগত না থেকে সমাজের দরিদ্র শ্রেণির কাছে পৌঁছায় তখন একটি সুষম ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম শেখায় যে ওপরের হাত নিচের হাতের চেয়ে উত্তম অর্থাৎ দাতার মর্যাদা গ্রহীতার চেয়ে বেশি (সহীহ আল-বুখারী, ১৪২৯)। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ অসহায়ের পাশে না দাঁড়ায় তবে তার ঈমানের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল পুণ্য নয় বরং এটি সময়ের দাবি। পরিশেষে বলা যায় যে অসহায়কে দান করা কেবল একজন মানুষের ওপর দয়া নয় বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম যা ইহকাল ও পরকালে চিরস্থায়ী সফলতা বয়ে আনে।

banner
Link copied!