বুধবার, ০৬ মে, ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩

ইরানে ‍‍`শত্রুর চর‍‍` দমনে ফাঁসি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত জোরদার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৫, ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

ইরানে ‍‍`শত্রুর চর‍‍` দমনে ফাঁসি ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত জোরদার

ইরানের বিচার বিভাগ বিদেশি স্বার্থে কাজ করার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‍‍`চূড়ান্ত এবং কঠোর‍‍` আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে বিচার বিভাগীয় এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, শত্রুদের চর বা ভাড়াটে হিসেবে কাজ করা কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরকারবিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই ধরপাকড় আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এই কঠোর হুঁশিয়ারির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জানুয়ারি মাসের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তিন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা ওই বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইন্ধনে পরিচালিত একটি ‍‍`অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা‍‍` হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে ওই তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয় যে, তারা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের চর এবং দাঙ্গার মূল হোতা। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সদস্যদের ওপর ছুরি ও তলোয়ার নিয়ে হামলা এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের দায়ে তাদের এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে ইসফাহান শহরে ২১ বছর বয়সী সাসান আজাদভার নামের এক যুবককেও একই ধরনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। তার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি মিনিবাসে পাথর ছোঁড়া এবং সরকারি বাসের জানালা ভাঙার অভিযোগ ছিল, যা বিচার বিভাগের মতে ‍‍`শত্রুর সাথে সহযোগিতার‍‍` শামিল।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দাবি, ইরানে গ্রেপ্তারকৃতদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না। ইরান হিউম্যান রাইটস এবং টুগেদার অ্যাগেইনস্ট দ্য ডেথ পেনাল্টি নামের দুটি সংস্থার গত মাসের একটি যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইরানে কমপক্ষে ১৬৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি। জাতিসংঘ গত এপ্রিলের শেষে নিশ্চিত করেছে যে, চলতি বছরের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অন্তত ২১ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং চার হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষ এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা দাবি করছে যে, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা হলেও তা সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অনুমোদনেই সম্পন্ন হচ্ছে।

ফাঁসি এবং কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও সমান্তরালভাবে চলছে। বিচার বিভাগ মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে যে, তেহরানের পূর্বে অবস্থিত সেমনান প্রদেশে ‍‍`জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং বৈরী দেশের সাথে সংযোগ‍‍` রাখার অভিযোগে ২২ জন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি যখন চরম চাপের মুখে, ঠিক তখনই এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সাধারণ ব্যবসায়ীদেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, পণ্য মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হলে ২০ বছরের কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত এবং বিপুল অঙ্কের জরিমানা করা হবে।

এই মুহূর্তে ইরানের সাধারণ মানুষ এক চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ, গাড়ি এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম দেশজুড়ে আকাশছোঁয়া। যদিও বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি চলছে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আবদোল নাসের হেমমাতি মঙ্গলবার বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে ‍‍`অগ্রহণযোগ্য‍‍` বলে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেন। হেমমাতি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে তাদের প্রতিরোধ কাজ করছে এবং শিগগিরই এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ থেকে তারা বিজয়ী হয়ে ফিরবেন। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, আন্তর্জাতিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়ে সাধারণ ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্রমেই আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

banner
Link copied!