পূর্ব লন্ডনের রেইনহ্যামে অবস্থিত শার্প গ্রুপের রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে প্রতিদিন কয়েকশ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ধুলোবালি, অসহ্য শব্দ এবং কনভেয়ার বেল্টের বিরামহীন চলাচলের মধ্যে এই কাজ করা মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। এই কঠিন বাস্তবতায় শার্প গ্রুপ তাদের বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রক্রিয়ায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তারা ব্যবহার করছে `আলফা` বা `অটোমেটেড লিটার প্রসেসিং হিউম্যানয়েড অ্যাসিস্ট্যান্ট` নামক একটি রোবট। এই রোবটটি মূলত মানুষের মতো অঙ্গভঙ্গি করে আবর্জনা থেকে প্রয়োজনীয় বস্তু আলাদা করতে সক্ষম। বিবিসি নিউজ ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই প্রযুক্তির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।
রিসাইক্লিং শিল্পে কাজ করা সবসময়ই একটি বিপজ্জনক বিষয়। শার্প গ্রুপের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে কাজ করা কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দুর্ঘটনার হার অন্যান্য শিল্পের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া মৃত্যুহারও জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিকূল পরিবেশ এবং কাজের ধরনের কারণে এখানে কর্মী ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারখানায় বার্ষিক কর্মী পরিবর্তনের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। লাইন সুপারভাইজার কেন ডর্ডয় জানান যে বেল্ট সবসময় চলতে থাকে এবং কর্মীদের বিরতিহীনভাবে কাজ করতে হয়। অনেক কর্মী এই পরিশ্রম সহ্য করতে না পেরে কাজ ছেড়ে দেন। এই কর্মী সংকটের সমাধান হিসেবেই হিউম্যানয়েড রোবট আলফার অন্তর্ভুক্তি।
আলফা নামক এই রোবটটি চীনের রিয়েলম্যান রোবটিক্স তৈরি করেছে এবং ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান টেকনট্র্যাশ রোবটিক্স একে রিসাইক্লিং কাজের উপযোগী করে তুলছে। টেকনট্র্যাশের প্রতিষ্ঠাতা আল কস্তা মনে করেন যে রোবটকে মানুষের মতো শারীরিক আকৃতি দেওয়ার প্রধান কারণ হলো বিদ্যমান কারখানার কাঠামোতে একে সহজেই খাপ খাওয়ানো যায়। এতে আলাদাভাবে কোনো দামী যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। আলফা এখন প্রশিক্ষণের পর্যায়ে রয়েছে। কারখানার একজন কর্মী ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা ভিআর হেডসেট পরে রোবটটিকে হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন কীভাবে সঠিক বস্তুটি তুলে নিতে হয়।
প্রশিক্ষণের এই প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। রোবটটিকে প্রথমে চিনতে হয় যে কনভেয়ার বেল্টের ওপর কী বস্তু আসছে এবং দ্বিতীয়ত তা নিখুঁতভাবে তোলার কৌশল রপ্ত করতে হয়। হোলোল্যাব নামক একটি সিস্টেমের মাধ্যমে একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করে আলফাকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ ডেটা পয়েন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে রোবটটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। শার্প গ্রুপের ফিন্যান্স ডিরেক্টর চেলসি শার্প জানান যে এই রোবটটি অসুস্থ হবে না বা ছুটির আবেদন করবে না, যা তাদের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় সুবিধা।
রিসাইক্লিং খাতে অটোমেশন কেবল লন্ডনেই সীমাবদ্ধ নয়। কলোরাডো ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এএমপি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লেসিয়ার এই প্রতিযোগিতায় শামিল হয়েছে। এএমপির সিইও টিম স্টুয়ার্ট দাবি করেন যে তাদের রোবটগুলো মানুষের চেয়ে আট থেকে দশ গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে। তবে বর্জ্যের বৈচিত্র্য রোবটগুলোর জন্য একটি বড় বাধা। কখনো বিয়ারের ক্যান থেকে তরল ছিটকে আসা বা মাঝেমধ্যে হ্যান্ড গ্রেনেড ও আগ্নেয়াস্ত্রের মতো বিপজ্জনক বস্তু সামনে আসা যন্ত্রপাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। গ্লেসিয়ার রোবটিক্স তাদের এআই মডেলকে প্রায় ১০০ কোটি আইটেম থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করছে।
কারখানায় অটোমেশনের এই জোয়ার মানুষের কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে শার্প গ্রুপের পরিকল্পনা হলো তাদের বর্তমান কর্মীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা। তারা তখন সরাসরি আবর্জনা না ঘেঁটে রোবটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার কাজ করবে। এতে কর্মীরা কারখানার ক্ষতিকর ধুলোবালি ও যান্ত্রিক গোলমাল থেকে দূরে থাকবে এবং একটি নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারবে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারিয়ান চের্টো মনে করেন যে রিসাইক্লিং খাতে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রোবটিক্স ও এআই-এর ব্যবহার এখন কেবল অনিবার্য নয় বরং অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
