হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও চরম সংঘাতের দিকে মোড় নিয়েছে। সোমবার সকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেল বন্দরে ইরানের ড্রোন হামলার পর সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময় আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে রুখে দিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর এটিই আমিরাতের ওপর ইরানের পক্ষ থেকে চালানো প্রথম বড় ধরনের হামলা। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিবিসি নিউজ ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুজাইরা সরকারের মিডিয়া অফিস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে ইরান থেকে আসা ড্রোনগুলো তাদের পেট্রোলিয়াম শিল্পাঞ্চলে আঘাত হানে। ফুজাইরা বন্দরটি আমিরাতের অন্যতম প্রধান তেল মজুদাগার এবং রপ্তানি কেন্দ্র। অগ্নিনির্বাপক বাহিনী কয়েক ঘণ্টা ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরান মোট চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছিল। এর মধ্যে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করা হয় এবং চতুর্থটি সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে আমিরাতের বিভিন্ন অংশে বিকট শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
উত্তেজনার পারদ আরও চড়েছে যখন একই দিনে হরমুজ প্রণালীতে অবস্থানরত একটি দক্ষিণ কোরীয় মালবাহী জাহাজে রহস্যজনক বিস্ফোরণ ও আগুনের খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মহাসাগর ও মৎস্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পানামা পতাকাবাহী ‘এইচএমএম নামু’ (HMM Namu) জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছাকাছি নোঙর করা ছিল। জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। তবে সৌভাগ্যবশত জাহাজে থাকা ২৪ জন ক্রু সদস্যের কেউ হতাহত হননি। সিউল ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইয়োনহাপ জানিয়েছে, জাহাজটি হামলার শিকার হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় নৌ-চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাগযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সোমবার দাবি করেছে যে তাদের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’-এর অধীনে মার্কিন পতাকাবাহী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেসট্রয়ার জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দিয়েছে বলে পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে। সেন্টকমের মতে, এটি আটকা পড়া জাহাজ উদ্ধারের পথে একটি বড় সাফল্য। তবে ইরান এই দাবিকে ‘নির্ভেজাল মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, গত কয়েক ঘণ্টায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার তাদের অনুমতি ছাড়া এই পথ দিয়ে পার হতে পারেনি। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে এবং তাদের ফিরে যেতে বাধ্য করেছে।
বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালীর এই সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক মাস ধরে ইরানের এই অবরোধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কতটা সফল হবে তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ একদিকে আমেরিকা তার নৌ-শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে তার আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া।
ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শান্তি আলোচনার সমান্তরালে এই সামরিক তৎপরতা মূলত কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়—এমন ইঙ্গিত দেয়। এর আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, যা ট্রাম্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, কোনো বড় ধরনের সংঘাত ছাড়া এই সংকটের সমাধান হওয়া বেশ কঠিন। ফুজাইরা বন্দরের এই অগ্নিকাণ্ড এবং দক্ষিণ কোরীয় জাহাজে বিস্ফোরণ প্রমাণ করে যে হরমুজ প্রণালী এখন একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
