সুপারমার্কেটে কেনাকাটা করার সময় আমরা কী কিনছি বা কী খাচ্ছি, তা অনেক সময় আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি প্যাকেটের ওপরের তথ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের যে সমস্যা বাড়ছে, তার অন্যতম কারণ হলো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বা আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (ইউপিএফ)। সম্প্রতি ল্যানসেট-এর একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে যে, যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে তবে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্থূলতার শিকার হতে পারেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাবারের প্যাকেটে সঠিক ও সহজবোধ্য লেবেলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে গবেষকরা মনে করছেন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের পাবলিক হেলথ গবেষক ফ্রাঙ্কো সাসি জানিয়েছেন যে, মানুষ মনে করে তারা নিজের ইচ্ছায় খাবার পছন্দ করছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরিবেশ এবং প্যাকেজিংয়ের তথ্যই সেই পছন্দ নির্ধারণ করে দেয়। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যা মানুষের কাছে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এই আসক্তি কাটাতে এবং জনস্বাস্থ্য উন্নত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন বাধ্যতামূলক লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করছে। এর মধ্যে চিলির উদাহরণটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালে চিলি সরকার চিনি, লবণ বা ক্যালরি বেশি থাকা খাবারের প্যাকেটে বাধ্যতামূলকভাবে কালো লেবেল যুক্ত করার নিয়ম চালু করে। এর ফলে পরবর্তী কয়েক বছরে ক্যালরিযুক্ত খাবার কেনার হার প্রায় ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে।
ইউরোপের অনেক দেশে এখন ‘নিউট্রো-স্কোর’ বা পুষ্টি-মান নির্ধারণী লেবেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সবুজ থেকে লাল রঙের একটি স্কেল যা ক্রেতাকে বুঝতে সাহায্য করে যে খাবারটি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী। ফরাসি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চের গবেষক ম্যাথিল্ড টোভিয়ের জানিয়েছেন যে, এই ব্যবস্থা চালুর পর কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে চিনির পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়েছে। সুপারমার্কেটগুলোতেও পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারগুলোর বিক্রি বেড়েছে এবং নিম্নমানের খাবারের বিক্রি কমেছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন প্রমাণ করে যে ছোট একটি লেবেল মানুষের আচরণে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; কেবল লেবেল দেওয়াই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক স্যামুয়েল ডিকেন এবং অ্যাবি ফিশারের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক তথ্য প্রদানের পাশাপাশি মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ বা কোচিং দিলে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার হার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল কীভাবে বাজার থেকে স্বাস্থ্যকর খাবার চেনা যায় এবং বাড়িতে রান্নার অভ্যাস বাড়ানো যায়। গবেষণার শেষে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ওজন কমার পাশাপাশি তাদের সামগ্রিক সুস্থতার হারও বেড়েছে।
বর্তমানে বাজারগুলোতে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রাচুর্য থাকলেও সচেতনতা এবং সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। খাবারের লেবেল কেবল একটি সাধারণ তথ্য নয়, বরং এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষজ্ঞ সাসির মতে, আমাদের চারপাশের পরিবেশ আমাদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে, তাই নীতি নির্ধারকদের উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে স্বাস্থ্যকর পছন্দ করা সহজ হয়। এই বৈশ্বিক স্থূলতা সংকট কাটাতে হলে কেবল ব্যক্তিগত চেষ্টা নয়, বরং সরকারি পর্যায় থেকে লেবেলিং এবং প্রচারণার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এই লেবেলিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
