বর্তমান বিশ্বে সজনে পাতা বা মরিঙ্গা কেবল একটি সাধারণ শাক হিসেবে পরিচিত নয় বরং এটি এখন বিশ্বজুড়ে ‘সুপারফুড’ হিসেবে সমাদৃত। আধুনিক বিজ্ঞানের নানা গবেষণায় দেখা গেছে যে এই সাধারণ গাছের পাতায় এমন কিছু অসাধারণ পুষ্টিগুণ রয়েছে যা সচরাচর অন্য কোনো একক প্রাকৃতিক উৎসে পাওয়া কঠিন। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে সজনে গাছ অত্যন্ত সহজলভ্য হলেও এর প্রকৃত গুণাগুণ সম্পর্কে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুষ্টি সংস্থা এখন অপুষ্টি দূর করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সজনে পাতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সজনে পাতার বিস্ময়কর পুষ্টিগুণের দিকে তাকালে দেখা যায় যে এটি ভিটামিন ও মিনারেলের একটি শক্তিশালী আধার। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে সমপরিমাণ ওজনের নিরিখে সজনে পাতায় কমলার চেয়ে সাত গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে। এছাড়া গাজরের চেয়ে চার গুণ বেশি ভিটামিন এ এবং দুধের চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় এই পাতায়। যারা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন তাদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর কারণ এতে পালং শাকের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি আয়রন বিদ্যমান। একই সঙ্গে কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম থাকায় এটি হাড় ও পেশির সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মেডিক্যাল নিউজ টুডে-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সজনে পাতায় প্রায় ৪৬ ধরণের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যা শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি প্রাকৃতিক আশীর্বাদ স্বরূপ। গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত সজনে পাতার গুঁড়ো বা চা পান করলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এছাড়া এটি উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও দারুণ কাজ করে।
হজমের সমস্যা ও পেটের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে সজনে পাতা প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এতে থাকা ফাইবার বা আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া এর অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে এবং সংক্রমণ রোধে সহায়তা করে। বর্তমান সময়ে দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে লিভারের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয় তা কমাতেও সজনে পাতা বিশেষ ভূমিকা রাখে। এটি লিভারের টিস্যুগুলোকে মেরামত করতে এবং বিষমুক্ত করতে সক্ষম।
সজনে পাতা খাওয়ার পদ্ধতিও বেশ সহজ ও বৈচিত্র্যময়। আমাদের দেশে সাধারণত সজনে পাতা শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। তবে আধুনিক ডায়েটে এর শুকনা পাতার গুঁড়ো বা মরিঙ্গা পাউডার বেশ জনপ্রিয়। এই গুঁড়ো ফলের রস, স্মুদি বা গরম জলের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। এমনকি ভাতের সঙ্গে বা ডালের সঙ্গেও এটি মিশিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে যে কোনো কিছুই অতিরিক্ত খাওয়া ভালো নয়। প্রতিদিন এক থেকে দুই চা চামচ সজনে পাতার গুঁড়ো একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য যথেষ্ট বলে পুষ্টিবিদরা মনে করেন।
তবে সজনে পাতা খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী বা যারা নিয়মিত নির্দিষ্ট কোনো রোগের ওষুধ সেবন করছেন তাদের উচিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এটি শুরু করা। এছাড়া অতিরিক্ত সেবনে অনেকের পেটে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সার্বিকভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে সজনে পাতা আসলেই একটি অলৌকিক উদ্ভিদ যা আমাদের হাতের কাছেই থাকে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এই সুপারফুড যোগ করার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে একটি সুস্থ ও সবল জীবন নিশ্চিত করতে পারি।
