২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র দেড় মাস সময় বাকি থাকলেও ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো কাটছে না ধোঁয়াশা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ম্যাচ খেলার ক্ষেত্রে ইরানের অনাগ্রহ এবং ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি পরিস্থিতিকে এক জটিল মোড় এনে দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সঙ্গে আগামী ২০ মে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে এক জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন। ফিফার সাধারণ সম্পাদক মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম ইতিমধ্যে ইরানি প্রতিনিধিদের এই বৈঠকে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইরানের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের ম্যাচগুলো আয়োজনের দাবি জানানো হলেও ফিফা এখন পর্যন্ত সেই আবেদনে সায় দেয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। ওই সময় ইরানি ভূখণ্ডে হামলার ঘটনার পর থেকে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ইরানি কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দিয়েছিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরে ফুটবল ম্যাচ খেলতে স্বস্তিবোধ করছে না। বর্তমান সূচি অনুযায়ী গ্রুপ পর্বে ইরানের ম্যাচগুলো লস অ্যাঞ্জেলস এবং সিয়াটলে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া প্রতিযোগিতার পরবর্তী রাউন্ডগুলোতে ডালাসে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার একটি জোরালো সম্ভাবনাও রয়েছে। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ জানিয়েছেন যে এই ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তন করা তাদের জন্য এখন সময়ের দাবি এবং এ বিষয়ে ফিফার সঙ্গে তাদের খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।
তবে কূটনীতির মাঠ ফুটবল মাঠের মতোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ইরানি প্রতিনিধিদের। কিন্তু টরন্টো বিমানবন্দরে কানাডিয়ান ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হাতে ইরানি কর্মকর্তারা যে ধরণের আচরণের শিকার হয়েছেন তা নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কানাডার এই অসহযোগিতামূলক আচরণের কারণে ইরানি প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে যোগ না দিয়ে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন। মেহদি তাজ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন যে বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে এ ধরণের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি মনে করেন এই ধরণের আচরণ ২০২৬ বিশ্বকাপের সুষ্ঠু আয়োজনের পথে বড় একটি অন্তরায়।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত অনড় অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন যে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই ২০২৬ বিশ্বকাপের সব ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে এবং কোনো দলের অনুরোধেই ভেন্যু পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ইনফান্তিনোর মতে বিশ্বকাপের মতো বড় একটি টুর্নামেন্টের সফল আয়োজনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে ফুটবলকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তবে ইরানের দাবি কেবল রাজনৈতিক নয় বরং তারা একে নিজেদের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে যেখানে সম্ভাব্য নকআউট পর্বে ডালাসে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের উদ্বেগ অমূলক নয় বলেই অনেকে মনে করছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ান বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফর্ম করে টানা চতুর্থবারের মতো মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ইরান। তারা বর্তমানে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং ফুটবলের মানচিত্র অনুযায়ী তারা অন্যতম শক্তিশালী একটি প্রতিপক্ষ। বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে ইরানের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে বেলজিয়াম, মিশর ও নিউজিল্যান্ড। এই গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে যাওয়ার শক্তিশালী সম্ভাবনা থাকলেও মাঠের বাইরের এই বিতর্ক খেলোয়াড়দের মনোসংযোগ নষ্ট করছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০ মে জুরিখের বৈঠকে যদি কোনো সমাধান না আসে তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক নতুন নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এখন ফুটবল প্রেমীদের চোখ জুরিখের সেই সংকট বৈঠকের দিকে যেখানে নির্ধারিত হবে ইরানের বিশ্বকাপের ভাগ্য।
