ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনি কর্মীদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হামাসকে সমর্থনের অভিযোগে ইউরোপীয় আদালতে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি কর্মীকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছে। এসব মামলার ভিত্তি হিসেবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সংগৃহীত তথ্যের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে, যা নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।
ইতালির ফিলিস্তিনি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হানুনকে গত বছরের ডিসেম্বরে হামাসে অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে সাত মিলিয়ন ইউরো অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে ইতালির সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আদালত মামলার প্রমাণগুলোকে অস্পষ্ট এবং অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বর্ণনা করে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। মোহাম্মদ হানুন এবং তার সঙ্গীরা দাবি করেছেন যে, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
একই ধরণের ঘটনা ঘটেছে নেদারল্যান্ডসে। ডাচ বংশোদ্ভূত ফিলিস্তিনি আমিন আবু রশিদকে হামাসে অর্থায়নের অভিযোগে কারাবন্দি করা হলেও দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে রটারডামের একটি আদালত তাকে খালাস প্রদান করে। মামলার রায়ে উল্লেখ করা হয় যে, ইসরায়েলি সরকারি প্রতিবেদন এবং অসংযোজিত সংবাদ নিবন্ধের ওপর ভিত্তি করে আনা এই অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে কৌঁসুলিরা।
আইনজীবীদের মতে, এসব মামলায় তথাকথিত ব্যাটেলফিল্ড এভিডেন্স বা যুদ্ধক্ষেত্রের সাক্ষ্য-প্রমাণ ব্যবহার করা হচ্ছে। সাধারণত সামরিক অভিযান চলাকালীন সময়ে সংগৃহীত এই তথ্যের আইনি গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইউরোপের আদালতেও বিতর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী, কোনো প্রমাণ আদালতে পেশ করার আগে তার সংগ্রহের উৎস এবং চেইন অফ কাস্টডি বা ধারাবাহিক নথিবদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের সরবরাহকৃত তথ্যে এই ধরণের কোনো নথিবদ্ধকরণ বা স্বচ্ছতা নেই।
মানবাধিকার সংস্থা কেইজ ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে যে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা কর্মীদের বিচার করা আইনের শাসনের জন্য বড় হুমকি। তাদের অভিযোগ, ইউরোপের আইনি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজকে দমন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আইনজীবী নিকোলা ক্যানেস্ট্রিনি, যিনি মোহাম্মদ হানুনসহ অন্যান্যদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যুক্তি দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিচারাধীন একটি রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহকৃত তথ্যের ওপর নির্ভর করা আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তার মতে, ইতালীয় কর্তৃপক্ষ কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করছে, যা ইউরোপের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
