শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ার দাবি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৩, ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ার দাবি

ছবি : সংগৃহীত

জাতিসংঘ শনিবার স্লোভাকিয়া ও তানজানিয়ার কিছু ঐতিহাসিক স্থানকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্রমবর্ধমান দাবির মুখোমুখি হয়েছে বলে BBC News এবং Reuters নিশ্চিত করেছে। সাধারণত এই বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আন্তর্জাতিক মর্যাদা, বৈশ্বিক পরিচিতি এবং পর্যটন খাতের রাজস্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু স্লোভাকিয়ার ভলকোলিনেক গ্রাম এবং তানজানিয়ার এনগোরোনগোরো সংরক্ষণ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা এই মর্যাদার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন অবস্থান নিয়েছেন। অতিরিক্ত পর্যটন এবং স্থানীয়দের নিজস্ব জমি থেকে উচ্ছেদের কারণে তারা এই আন্তর্জাতিক তকমা থেকে স্থায়ী মুক্তি চান।

স্লোভাকিয়ার মধ্য পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ভলকোলিনেক একটি প্রাচীন মধ্যযুগীয় গ্রাম যেখানে বর্তমানে মাত্র পচ্ছিস জন স্থায়ী বাসিন্দা পঁয়তাল্লিশটি রঙিন কুটিরে বসবাস করেন। এই গ্রামের অনন্য কাঠের স্থাপত্যের কারণে এক হাজার নয়শত তিরানব্বই সালে একে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা ভুক্ত করা হয়েছিল। এর পর থেকে প্রতি বছর সেখানে এক লাখের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক আসতে শুরু করে যা এখানকার শান্ত সামাজিক জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একইভাবে তানজানিয়ার এনগোরোনগোরো অঞ্চলের মাসাই আদিবাসী জোট দাবি করেছে যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণের নামে তাদের পূর্বপুরুষের চারণভূমি থেকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। তারা মনে করেন এই বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা স্থানীয় মানুষের মৌলিক মানবাধিকার এবং আদিবাসী জীবনজীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক এই বিশেষ সংস্থার বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা বর্তমানে এক হাজার দুইশত আটচল্লিশটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক স্থান নিয়ে গঠিত যা বিশ্বজুড়ে একশত সত্তরটি রাষ্ট্রে ছড়িয়ে রয়েছে। অতীতে এই বিশেষ মর্যাদা বিভিন্ন বিপন্ন ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল ও কঠোর পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বর্তমান যুগে এই মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত আগমন স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইতালির ভেনিস শহর এক হাজার নয়শত সাতাশি সালে এই বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা ভুক্ত হওয়ার পর থেকে ইউরোপের সবচেয়ে জনাকীর্ণ ও পর্যটন-পীড়িত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এই অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে জীবনযাত্রারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভেনিসের মূল বাসিন্দারা তাদের নিজস্ব শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। একইভাবে চীনের লিজিয়াং আদিবাসী অঞ্চল এবং মরক্কোর মারাকেচ শহরের প্রাচীন এলাকাগুলোও একই ধরনের গুরুতর আবাসন ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে প্রাচীন আবাসিক বাড়িঘরগুলো দ্রুত স্যুভেনির শপ এবং গেস্টহাউসে রূপান্তরিত হচ্ছে যা স্থানীয় ঐতিহ্যকে হালকা করে দিচ্ছে। গবেষকরা এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়াটিকে জীবন্ত সম্প্রদায়ের মিউজিয়ামে রূপান্তর বা মিউজিয়ামিফিকেশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন যেখানে একটি প্রাণবন্ত সমাজ কেবল বহিরাগত দর্শকদের বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি কীভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করে ঐতিহ্য সংরক্ষণের নতুন বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়ন করবে। ক্যালিফোর্নিয়ার হেরিটেজ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে পর্যটকদের আগমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই মর্যাদা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা নিয়ে এই চলমান তীব্র বিতর্ক আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের সামনে প্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণের সাথে স্থানীয় মানুষের মানব কল্যাণের ভারসাম্য রক্ষার এক নতুন জটিল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।

banner
Link copied!