যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে চলমান ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম হাইভোল্টেজ ম্যাচে শক্তিশালী ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মরক্কো, যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বিবিসি স্পোর্ট নিশ্চিত করেছে। আগামীকাল বাংলাদেশ সময় ভোর চারটায় অনুষ্ঠিতব্য এই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের আগে সংবাদ সম্মেলনে মরক্কোর তারকা ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি এবং প্রধান কোচ ওয়াহবি দলের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে চরম আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে খেলার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জনকারী মরক্কো এবার আরও পরিপক্ক দল হিসেবে মাঠে নামছে। সবুজ ঘাসের মাঠে সুন্দর ফুটবল খেলার নিজস্ব ঘরানার কারণে ফুটবল বিশ্বে ইতিমধ্যেই তারা ‘আফ্রিকার ব্রাজিল’ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে সমানে সমানে লড়াই করতে মরক্কোর ডেরা এখন পুরোপুরি প্রস্তুত বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্যারিস সেন্ট জার্মেই বা পিএসজি এর এই বিশ্বমানের রাইট ব্যাক আশরাফ হাকিমি সংবাদ সম্মেলনে প্রতিপক্ষ দলের অন্যতম প্রধান ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং ব্রাজিলের শক্তিশালী আক্রমণভাগকে সামলানো নিয়ে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে ভিনিসিয়ুসের খেলার অসাধারণ গুণাবলী সম্পর্কে তাদের পুরো রক্ষণভাগ অত্যন্ত সচেতন এবং ক্লাব ফুটবলে তিনি নিজে একাধিকবার এই ব্রাজিলীয় তারকার বিরুদ্ধে মাঠে লড়াই করেছেন। হাকিমি জোর দিয়ে বলেন যে ব্রাজিলের সমস্ত খেলোয়াড়ই বিশ্বমানের এবং তাদের গতিশীল ফুটবলকে রুখতে হলে রক্ষণভাগকে ব্যক্তিগত দক্ষতার চেয়ে দলগত সংহতির ওপর বেশি জোর দিতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট এবং পরিষ্কার রণকৌশল নিয়ে মাঠে নামার জন্য তারা দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর অনুশীলন করেছেন এবং আগামীকাল নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আশাবাদী।
বিশ্বকাপের ইতিহাসের সফলতম দল ব্রাজিলের ঐতিহ্য এবং তাদের খেলোয়াড়দের একক সামর্থ্য নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই উল্লেখ করে হাকিমি বলেন যে তাদের নিজেদের দলেও বিশ্বমানের প্রতিভাবান ফুটবলার রয়েছে। পুরো মরক্কো এবং আরব বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন এই টুর্নামেন্টে তাদের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে আপাতত সেমিফাইনাল বা তার চেয়ে বড় কোনো দূরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তারা প্রতিটি ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চান। তাদের মূল লক্ষ্য হলো গত বিশ্বকাপের চেয়েও ভালো কিছু করা এবং সেই দীর্ঘ যাত্রার সফল সূচনা করতে তারা আগামীকালকের ম্যাচে পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছেন। মরক্কোর ফুটবলারদের এই অটল আত্মবিশ্বাস এবং মাঠেের লড়াকু মানসিকতা দলের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মরক্কোর প্রধান কোচ ওয়াহবি সংবাদ সম্মেলনে দলের অভ্যন্তরীণ ইতিবাচক পরিবেশ এবং রণকৌশল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা এবং দলের নিজস্ব ফুটবল দর্শনের ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে নরওয়ের বিরুদ্ধে খেলা ম্যাচটি থেকে তারা নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো চমৎকারভাবে বুঝতে পেরেছেন যা এই বড় ম্যাচের আগে তাদের বেশ ভালো অবস্থানে রেখেছে। তবে দলের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আবদে এজালজুলি এবং রক্ষণভাগের নায়েফ আগুয়ের্দের আকস্মিক ইনজুরি বা চোট মরক্কো শিবিরের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কোচ ওয়াহবি অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে এই দুজনের অনুপস্থিতির কারণে দলে কিছু বাধ্যবাধকতামূলক পরিবর্তন আনতে হলেও তাদের খেলার মূল আক্রমণাত্মক দর্শন এবং মূল্যবোধে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, রক্ষণভাগের প্রধান তারকা নায়েফ আগুয়ের্দের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা রদ্রিগোর মতো ক্ষিপ্রগতির ফরোয়ার্ডদের আক্রমণাত্মক ঢেউ মরক্কোর নতুন রক্ষণব্যূহ কতটা সফলভাবে সামাল দিতে পারবে। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ বলেই তারা নিজেদের ফুটবল খেলার মৌলিক নীতি থেকে বিচ্যুত হবেন না বরং নিজেদের চেনা ছন্দে সাম্বার দেশকে রুখে দিতে চান। মরক্কো কোচের এই দৃঢ় অবস্থান কেবল দলের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিতই করেনি, বরং বিশ্বমঞ্চে ফুটবল পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক নতুন স্পৃহা তৈরি করেছে। এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর থাকবে লস অ্যাঞ্জেলেসের সবুজ মাঠে মরক্কো তাদের এই লড়াকু ফুটবল দর্শন ও নিখুঁত রণকৌশল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারে তার ওপর।
