ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীয়ের জানাজা আগামী চার জুলাই তেহরানে শুরু হবে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, আল জাজিরা এবং রয়টার্স শনিবার প্রকাশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এর আগে মার্চ মাসে নির্ধারিত থাকা তাঁর দাফন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী জুলাই মাসের চার তারিখ থেকে রাজধানী তেহরানে তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় জানাজা ও বিশেষ শোকানুষ্ঠান শুরু হবে। এরপর আগামী সাত জুলাই পবিত্র কোম নগরীতে আরেকটি জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং আগামী নয় জুলাই তাঁর নিজ শহর মাশহাদে চূড়ান্ত দাফন সম্পন্ন করা হবে। এই জাতীয় জানাজা শুরুর দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের সাথে একই দিনে পড়েছে।
বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের রাজধানীতে তাঁর নিজস্ব প্রশাসনিক বাসভবনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি যৌথ বিমান হামলার ঘটনায় ছিয়াশি বছর বয়সী এই প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা নিহত হন। এরপর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতের সূচনা হয় যার ফলে দেশটির সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামো এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী দীর্ঘ সময় ধরে অর্থাৎ এক হাজার নয়শত ঊননব্বই সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মুসলিম বিশ্বের এই দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। এর আগে এক হাজার নয়শত ঊনআশি সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের মূল রূপকার আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর ইন্তেকালের পর তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। খোমেনী যেখানে বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে খামেনী ইরানের আধুনিক সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে একটি শক্তিশালী কাঠামোয় রূপ দেন।
তাঁর মৃত্যুর পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর সুযোগ্য পুত্র মোজতবা খামেনীর নাম ঘোষণা করা হলেও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি জনসাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ইরানের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক রূপান্তর এবং ক্ষমতার দীর্ঘমেয়াদী ধারাবাহিকতা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সামরিক কৌশলের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। তবে চলতি জুনের শুরুর দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে গত আট এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনী পর্দার আড়ালে থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনা ও নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর শাসনামলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার নিজস্ব প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং প্রতিরোধ অক্ষকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করেছিল যা পশ্চিমাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ ছিল। দীর্ঘ চার দশক ধরে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসের সেই ভয়াবহ বিমান হামলায় খামেনীর মৃত্যুর পর তেহরানের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যা পরবর্তীতে সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। নতুন সময়সূচী অনুযায়ী জানাজা অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে তেহরানের রাস্তায় জীবনের এক ধরনের স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে বলে স্থানীয় স্বাধীন সংবাদদাতারা জানিয়েছেন। তবে প্রয়াত নেতার শেষ বিদায়ে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামার সম্ভাবনা থাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। মোজতবা খামেনী এই জানাজা অনুষ্ঠানগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সামনে বক্তব্য দেবেন কি না তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা-চলছে। ইরান তার অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মুসলিম উম্মাহর অধিকার আদায়ে খামেনীর প্রদর্শিত নীতিতেই অবিচল থাকবে বলে তেহরানের বর্তমান নীতিনির্ধারকরা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
