ইসলামে সর্বপ্রকার অপার্থিব প্রার্থনা ও অলৌকিক সাহায্য কেবল একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই করা ওয়াজিব এবং অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে এমন প্রার্থনা করা স্পষ্ট শিরক বলে শনিবার ঢাকার এক বিশেষ সেমিনারে বিশিষ্ট গবেষক মুফতি আবদুল্লাহ নূর উম্মাহ কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। মানব জীবনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে দোয়ার গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি একই সাথে গভীর ইবাদত এবং মানসিক প্রশান্তি লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়াকে ইবাদতের মূল মগজ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং উম্মতকে সর্বদা আল্লাহর নিকট প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। সুনানে তিরমিজির একটি সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে কিছু চায় না আল্লাহ তাআলা তার প্রতি চরম ক্ষুব্ধ হন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৭৩)। তবে দোয়ার ক্ষেত্রে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট কিছু বিধি ও নীতিমালা রয়েছে যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় মানবীয় চাওয়া বা প্রার্থনাকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে যার একটি হলো পার্থিব বা লৌকিক এবং অন্যটি হলো অপার্থিব বা অলৌকিক। পার্থিব বা সাধারণ জাগতিক প্রার্থনা মানুষ স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মে পরস্পরের কাছে করতে পারে এবং এতে কোনো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা নেই। মানুষ বাহ্যিক উপায়ে একে অপরকে সাহায্য করার সামর্থ্য রাখে যেমন কারো কাছে আর্থিক ঋণ চাওয়া, কোনো বিপদে অন্যকে সাহায্যের জন্য ডাকা অথবা মাথায় ভারী বোঝা তুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা। এই ধরনের চাওয়া মানুষের স্বভাবজাত সামাজিক আচরণের অংশ এবং ইসলামে এটি সম্পূর্ণ বৈধ হিসেবে গণ্য হয়।
কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের প্রার্থনা যা অপার্থিব বা জাগতিক মাধ্যম ছাড়া সরাসরি অলৌকিক সাহায্য ও মুক্তি কামনার সাথে যুক্ত তা কেবল একমাত্র স্রষ্টার কাছেই নিবেদন করতে হবে। এই জাতীয় প্রার্থনা মূলত একজন মুমিনের ঈমান ও বিশ্বাসের সর্বজনীন প্রকাশ এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে এই অলৌকিক সাহায্য চাওয়া ইসলামের মূল আকিদার পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনের সূরা মুমিনের ষাট নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে তোমাদের প্রতিপালক বলেন তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব আর যারা অহংকার বশত আমার ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে (সূরা মুমিন, আয়াত: ৬০)। এই ঐশী বাণী স্পষ্ট প্রমাণ করে যে দোয়া নিজেই একটি স্বতন্ত্র ইবাদত এবং একে আল্লাহর সাথে অংশীদার করা যাবে না।
বর্তমান সমাজে গভীর অজ্ঞতার কারণে অনেকেই বিভিন্ন আল্লাহর ওলি, পীর বা দরবেশের মাজার ও কবরে গিয়ে অপার্থিব ও অলৌকিক বিষয়গুলো প্রার্থনা করেন যা কোনোভাবেই বৈধ নয়। ইসলামের সূচনালগ্নে মক্কার মুশরিকরাও তাদের আপদ-বিপদ দূর করার জন্যফেরেশতা এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের কাছে অপার্থিব প্রার্থনা করত যাদের মর্যাদা বর্তমান যুগের যেকোনো ওলি-বুজুর্গের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তবুও মহান আল্লাহ তাদের এই আচরণকে স্পষ্ট শিরক বা অংশীদারিত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করে তা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা বনি ইসরাইলে এর অসারতা বর্ণনা করে বলা হয়েছে যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাস্য মনে করো তাদের আহ্বান করো তাহলে দেখবে তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার বা তা পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৫৬-৫৭)।
যা কম স্পষ্ট তা হলো গ্রামীণ অঞ্চলের সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই মাজার কেন্দ্রিক লোকজ বিশ্বাসগুলোকে সঠিক আকিদার আলোয় পুরোপুরি সংস্কার করতে কত দীর্ঘ সময় লাগবে। যেহেতু দোয়া ইবাদতের মূল প্রকাশ এবং এই ক্ষেত্রে মানুষ সবচেয়ে বেশি কুসংস্কারে লিপ্ত হয় তাই পবিত্র কোরআনে এই বিষয়ে দুই শতাধিক স্থানে মানবজাতিকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তাঁর বিখ্যাত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীন যুগের মুশরিকরা রোগমুক্তি বা সচ্ছলতার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নামে মানত করত এবং তাদের উপাস্যদের নাম জপ করত। এই মারাত্মক ভুল দূর করার জন্যই মহান আল্লাহ সালাতের মধ্যে প্রতিদিন সূরা ফাতিহার মাধ্যমে ঘোষণা করতে নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
বাংলার প্রসিদ্ধ পীর ও সমাজ সংস্কারক ফুরফুরার পীর শায়খ আবু বকর সিদ্দিকীর নির্দেশনায় আল্লামা রুহুল আমিন এই দোয়া ও প্রার্থনা বিষয়ক শিরকগুলোর বিস্তারিত সামাজিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি তাঁর বিভিন্ন গবেষণামূলক কিতাবে লিখেছেন যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে গায়েবি ইলম বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করা স্পষ্ট কুফরি ও শিরক। গভীর বিপদে পড়ে হে শায়খ আবদুল কাদের জিলানী আল্লাহর জন্য আমাকে কিছু দিন অথবা হে খাজা শামসুদ্দিন পানিপতি আল্লাহর জন্য আমাকে কিছু দিন এমন বাক্য মুখে উচ্চারণ করা সরাসরি ঈমান বিধ্বংসী কাজ। মানুষের আকিদা ও বিশ্বাস যদি শতভাগ নিখুঁত না হয় তবে তার সমস্ত বাহ্যিক ইবাদত পরকালে মূল্যহীন হয়ে পড়বে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য কেবল তাঁরই দরবারে বিনম্রভাবে হাত তুলতে হবে।
