বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সীমান্তবাসীর প্রাত্যহিক জীবন ও ৭টি জরুরি শরয়ি মাসয়ালা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১১, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

সীমান্তবাসীর প্রাত্যহিক জীবন ও ৭টি জরুরি শরয়ি মাসয়ালা

ভৌগোলিক সীমারেখা মানুষকে পৃথক করতে পারে, কিন্তু ঈমান, আত্মীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক জনপদ রয়েছে যেখানে কাঁটাতারের দুই পাশে আত্মীয়তা ও সংস্কৃতিতে একই সূত্রে গাঁথা মানুষ বসবাস করেন। বাংলাদেশ-ভারতসহ বিশ্বের নানা প্রান্তের সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত মুসলমানদের জীবনে রাষ্ট্রীয় আইন ও শরীয়তের বিধানের সমন্বয়ে কিছু অনন্য প্রশ্ন তৈরি হয়। এই বিশেষ পরিস্থিতির আলোকে ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি।

প্রথম ও প্রধান বিষয়টি হলো রোজা ও ঈদ পালন। সীমান্তের দুই পাশে অনেক সময় চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা দেয়। শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তি যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের চাঁদ দেখা কমিটি বা কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী রোজা ও ঈদ পালন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো। ভিন্ন অঞ্চলের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে নিজের অবস্থানস্থলের সময়সূচি পরিবর্তন করা শরিয়তসম্মত নয়।

দ্বিতীয়ত, নামাজের সময় নির্ধারণ। সীমান্তের দুই পাশে সময়ের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, যার ফলে আজান ও নামাজের সময় ভিন্ন হতে পারে। নামাজের ওয়াক্ত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। রদ্দুল মুহতারসহ নির্ভরযোগ্য ফিকহ গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে যে, নামাজ স্থানভিত্তিক সূর্যের অবস্থানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। পাশের দেশের আজান শোনা গেলেও নিজের অবস্থানস্থলের সময় না হওয়া পর্যন্ত ইফতার বা নামাজ আদায় করা বৈধ হবে না। এটি শৃঙ্খলা ও শরীয়তের বিধানের প্রতি আনুগত্যের পরিচায়ক।

তৃতীয়ত, জুমা ও জামাতের গুরুত্ব। যদি আইনসম্মতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা সম্ভব হয়, তবে অন্য দেশের জামাতে অংশ নেওয়া শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। তবে প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে নিজ দেশের স্থানীয় মুসলিম সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখা অধিক উত্তম। চতুর্থত, জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের এলাকার দরিদ্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও, সীমান্তের ওপারে থাকা নিকটাত্মীয় বা অধিক অভাবী ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। এটি একই সঙ্গে সদকা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার দ্বিগুণ সওয়াব অর্জনে সহায়তা করে।

পঞ্চমত, কোরবানির ক্ষেত্রে মালিকের উপস্থিতি কোনো শর্ত নয়। বর্তমানে অনেকেই এক দেশে থেকে অন্য দেশে কোরবানি করান। শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রতিনিধি বা ওকিল নিয়োগের মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন করা বৈধ। তবে মনে রাখতে হবে, পশু যে দেশে জবাই হবে, সেই দেশের ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ের পর জবাই সম্পন্ন করতে হবে। ষষ্ঠত, মুসাফিরের বিধান। সীমান্ত পার হয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলে একজন ব্যক্তি শরীয়ত অনুযায়ী মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেন। এ অবস্থায় নামাজে কসর করা এবং রোজার ক্ষেত্রে রুখসত গ্রহণ করা বৈধ।

সবশেষে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা। ভৌগোলিক সীমানা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার কোনো বৈধ কারণ হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যোগাযোগ, খোঁজখবর নেওয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখা প্রত্যেক মুমিনের ইমানি দায়িত্ব। কাঁটাতারের বেড়া আমাদের শরীরকে পৃথক রাখলেও, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন টিকিয়ে রাখা শরিয়তের অমোঘ নির্দেশনা। এই ভারসাম্যপূর্ণ বিধানগুলো মেনে চললে ভৌগোলিক জটিলতার মাঝেও একজন মুসলিম সঠিকভাবে তার ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন।

banner
Link copied!