পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে যে অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে পুরো ভারতের রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গেছে। নির্বাচনের পর থেকেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে কংগ্রেসের সঙ্গে পুনরায় জোট বাঁধতে পারেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিল্লিতে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার বৈঠক এবং রাহুল গান্ধীর সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাতের পর এই জল্পনা আরও তীব্র হয়। তবে বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কেসি ভেনুগোপাল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এমন কোনো আলোচনাই হয়নি।
কেসি ভেনুগোপাল এক সংবাদ সম্মেলনে এই খবরকে ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে যে বৈঠক হয়েছে, তা মূলত বিজেপি বিরোধিতার কৌশল এবং জাতীয় ইস্যুগুলো নিয়ে কার্যকর আলোচনার জন্য। মমতার ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতারাও জানিয়েছেন, দল ভাঙার এই খবর বা কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার খবর সম্পূর্ণ কাল্পনিক। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কংগ্রেসের নেতারাও মমতার ফেরার পথে তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছেন, যা এই একত্রীকরণের সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে দিয়েছে।
এদিকে, বিধানসভা নির্বাচনে হারের প্রভাব তৃণমূলের অভ্যন্তরে এখন স্পষ্ট। একের পর এক বিধায়ক ও সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে প্রায় ৬৪ জন বিদ্রোহী বিধায়ক তৃণমূলের বিকল্প নতুন দল গড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, লোকসভায় কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জন সংসদ সদস্য ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন করার ঘোষণা দিয়েছেন, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় ধাক্কা।
উচ্চকক্ষ রাজ্যসভাতেও তৃণমূলের ভিত নড়ে গেছে। সুখেন্দু শেখর রায় এবং সুস্মিতা দেবের পর বৃহস্পতিবার সকালে উত্তরবঙ্গের তৃণমূল সাংসদ প্রকাশ চিক বরাইক ও নতুন সাংসদ অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক পদত্যাগ করেছেন। এতে রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা মাত্র ৯-এ নেমে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো দলের অস্তিত্ব বাঁচাতে কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলগত একীভূত হওয়ার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ও উভয় দলের অভ্যন্তরের আপত্তির কারণে তা এখন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে নিজস্ব রাজনৈতিক দল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে তিনি কংগ্রেসের রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন এবং ১৯৯১ সালে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের বিরোধ ও দূরত্বের পর রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে একত্রীকরণ একটি তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে আলোচিত হলেও, বাস্তবতা এখন ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তৃণমূলের একক ভোট ব্যাংক ও রাজনৈতিক শক্তি এখন চরম সংকটের মুখে।
