শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মদিনায় উমর (রা.)-এর শিলালিপিসহ বিপুল প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১২, ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম

মদিনায় উমর (রা.)-এর শিলালিপিসহ বিপুল প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার

ছবি : সংগৃহীত

সৌদি আরবের হেরিটেজ কমিশন মদিনা অঞ্চলের আল-মাহদ গভর্নরেটে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কার্যক্রমের দ্বিতীয় মৌসুমে ১,৭৭৪টি প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করেছে বলে শুক্রবার রিয়াদ থেকে সৌদি প্রেস এজেন্সি এবং আরব নিউজ নিশ্চিত করেছে। এই বিশেষ জরিপে অতীতের বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে যা ইসলামিক রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে দীর্ঘ ইতিহাসের অকাট্য সাক্ষ্য বহন করে। কমিশন আল-সুয়াইরিকিয়াহ, আল-মুওয়াইহিয়াহ এবং হাধাহ নামক তিনটি প্রধান জরিপ এলাকায় এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং সংরক্ষিত এসব নিদর্শন যুগের পর যুগ ধরে প্রাচীন মানব বসতির উপস্থিতির স্পষ্ট চিহ্ন বহন করে আসছে।

তাত্ক্ষণিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে জানা গেছে যে এই ব্যাপক জরিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে ১৫৬টি সম্পূর্ণ নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান বা কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। আবিষ্কৃত এসব মূল্যবান নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ৪৬১টি ইসলামিক শিলালিপি, ৩৪টি প্রাচীন সামুদীয় শিলালিপি, ১,২৫৯টি ঐতিহাসিক শিলাচিত্র বা রক আর্ট এবং ১১টি পাথরের তৈরি প্রাচীন স্থাপনা। একই সাথে সেখানে ৩টি ঐতিহাসিক রাজকীয় প্রাসাদ, ২টি প্রাচীন কাফেলা পথ এবং ৪টি প্রাচীন কূপের সন্ধান মিলেছে যা ওই অঞ্চলের প্রাচীন বাণিজ্যিক ও সামাজিক যোগাযোগের গভীর গুরুত্ব প্রমাণ করে। ইতিহাসের এই ধারা বর্তমান প্রজন্মের গবেষকদের প্রাচীন আরব উপদ্বীপের জনজীবন ও বাণিজ্যযাত্রা সম্পর্কে ধারণা পেতে বড় সাহায্য করবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর পবিত্র নামসংবলিত একটি প্রাচীন শিলালিপি। এর পাশাপাশি পাহাড়ের শক্ত পাথরের গায়ে খোদাই করা বেশ কিছু ধ্রুপদী আরবি কবিতারও সন্ধান পাওয়া গেছে যা এসব ঐতিহাসিক স্থানের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হেরিটেজ কমিশন জানিয়েছে যে তাদের এই কার্যক্রম সৌদি ভিশন ২০৩০ এর অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেশজুড়ে জোরদার করা হচ্ছে। নিজেদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তারা এই জাতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও নিয়মিত নথিভুক্তকরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন আবিষ্কৃত স্থানগুলোর সুরক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক গবেষকরা দীর্ঘমেয়াদী কোনো যৌথ পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন কিনা। এই সাফল্যের পাশাপাশি গত সপ্তাহে কমিশন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সটারের সাথে যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা本の প্রথম মৌসুম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। প্রাচীন আল-জুহফাহ মীকাত এলাকায় পরিচালিত এই গবেষণায় ১,৭০০ এরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে যা এক সময় মিসরীয় হজযাত্রীদের ঐতিহাসিক যাতায়াতের পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসের খণ্ডাংশ এবং মৃত্পাত্র পোড়ানোর জন্য ব্যবহৃত ৬টি বড় প্রাচীন চুল্লি।

গবেষক দল সেখানে একটি প্রাচীন পানি সরবরাহ খালেরও সন্ধান পেয়েছেন যা সম্ভবত ওই সময় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্লান্ত হজযাত্রী ও পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণ এবং সেবার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতো। এর পাশাপাশি সেখানে প্রাচীন উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগের ১৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাধিফলক আবিষ্কৃত হয়েছে যা ওই যুগের ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির ওপর নতুন করে আলো ফেলে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরও জানা গেছে যে উদ্ধারকৃত কিছু নিদর্শনের আদি উত্স ছিল প্রাচীন শাম বা লেভান্ট অঞ্চল, মিসর এবং প্রাচীন ইথিওপিয়া। এসব আন্তর্জাতিক আবিষ্কার প্রমাণ করে যে প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল থেকে আগত মুসলিম হজযাত্রীরা এই মীকাত এলাকাটি নিয়মিত অতিক্রম করতেন।

পবিত্র মক্কা নগরীর উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১৮৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই আল-জুহফাহ মীকাত ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকেই একটি সুপরিচিত প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐতিহাসিক হিজরতের গৌরবময় ইতিহাসের সাথেও এই পবিত্র স্থানটির অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকদের ধারণা অনুযায়ী দ্বিতীয় হিজরি শতকে এটি একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছিল যেখানে দূরবর্তী হজযাত্রীদের সার্বিক সেবায় পানির বিশেষ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক দোকানপাট গড়ে উঠেছিল। নতুন এই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো মুসলিম উম্মাহর প্রাচীন গৌরব এবং আরবের সমৃদ্ধ ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে কমিশন আশা প্রকাশ করেছে।

banner
Link copied!