আফ্রিকার দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে, যা একই সাথে মহাদেশটির কাঠামোগত দুর্বলতা ও শাসনতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতাকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ এবং আল জাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বর্তমানে আফ্রিকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬০ কোটি এবং জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২৫০ কোটিতে পৌঁছাবে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ হ্রাস এবং বৈদেশিক সহায়তার কাটছাঁটের এই সময়ে আফ্রিকার এই জনমিতিক পরিবর্তনকে অর্থনীতিবিদরা আর বোঝা হিসেবে দেখছেন না, বরং একে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি অনিবার্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিখ্যাত গবেষক জো স্টাডওয়েল তার ‘হাউ আফ্রিকা ওয়ার্কস’ গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, আফ্রিকা হয়তো এতদিনে এমন একটি জনসংখ্যা ঘনত্বে পৌঁছাতে পেরেছে যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিপুল জনসংখ্যা কোনো ব্যবস্থাপনার সংকট নয়, বরং এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক উড্ডয়ন, বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আফ্রিকার জন্য এখন মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে মহাদেশটিতে পর্যাপ্ত মানুষ আছে কি না, বরং বড় প্রশ্ন হলো সরকারগুলো এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কত দ্রুত উৎপাদনশীল খাতে নিয়োজিত করতে পারবে।
আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং জাতিসংঘের আফ্রিকান অর্থনৈতিক কমিশনের যৌথ প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে আফ্রিকার কর্মক্ষম জনসংখ্যা ভারত ও চীনের সম্মিলিত কর্মক্ষম জনশক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে। নাইরোবি, লাগোস, আক্রা এবং দার-এস-সালামের মতো শহরগুলো প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে দ্রুত গতিশীল ভোক্তা বাজার ও শ্রম হাবে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের একটি পরিসংখ্যান বলছে যে, বর্তমানে আফ্রিকার ৪৪ শতাংশ মানুষ নগরবাসী, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। তবে এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেরই নেই।
লেইডেন ইউনিভার্সিটির গবেষক মান্দিপা এনডলোভু আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্র ও নগর কর্তৃপক্ষ জনমিতিক চাপের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ভূমি সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মো ইব্রাহিম ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের সুশাসন সূচক অনুযায়ী, আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এমন কিছু দেশে বসবাস করছে যেখানে গত এক দশকে সুশাসনের মান চরমভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া কেবল জনসংখ্যার এই উচ্চ ঘনত্ব রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেভাবে ভূমি সংস্কার ও রপ্তানিমুখী ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, আফ্রিকা সেই পথ অনুসরণ করতে কতটা রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাবে।
স্টাডওয়েলের অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী, যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন শুরু হয় গ্রামীণ কৃষি খাতের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে শিল্প খাতে বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত তৈরি করে। কিন্তু জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, সাব-সাহারা অঞ্চলে শস্যের ফলন প্রতি হেক্টরে মাত্র ১.৫ থেকে ২ টন, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় তা ৪ টনেরও বেশি। ইথিওপিয়া এবং রুয়ান্ডার মতো কিছু দেশ দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষিতে কিছুটা সাফল্য দেখালেও মহাদেশের সিংহভাগ অঞ্চলে কৃষি খাত এখনো স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক চক্রের মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে। আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়ার মাধ্যমে ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের একটি একক বাজার গড়ার পরিকল্পনা থাকলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এর বাস্তবায়ন থমকে আছে।
জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার তথ্যমতে, সাব-সাহারা আফ্রিকার জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের অবদান মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ, যা যেকোনো শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। আফ্রিকা রিস্ক কনসাল্টিংয়ের বিশ্লেষক ক্রিস এদেগু উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে আফ্রিকায় প্রায় ১০ হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে যার এক-তৃতীয়াংশই উৎপাদনমুখী। তবে এই বিদেশী বিনিয়োগ যাতে কেবল কাঁচামাল লুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আফ্রিকার সরকারগুলোর। শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার এই অভূতপূর্ব জনসংখ্যা বিস্ফোরণ মহাদেশটির জন্য অভিশাপ নাকি আশির্বাদ হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান নেতৃত্বের সঠিক নীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।
