যুক্তরাজ্যের বিচার ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন ও বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নামক একটি প্রতিবাদী সংগঠনের চারজন কর্মীকে শুক্রবার ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সাজা দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যদিও জুরি কর্তৃক তাদের বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগগুলো ছিল কেবল ‘ক্রিমিনাল ড্যামেজ’ বা সম্পদের ক্ষতিসাধন, কিন্তু ব্রিটিশ বিচার বিভাগ এখন তাদের অপরাধে ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ (terrorist connection) যুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছে। গত বছর জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
গত মাসে লন্ডনের উলউইচ ক্রাউন কোর্টে ছয়জন কর্মীর বিচার সম্পন্ন হয়। এদের মধ্যে চারজনকে ২০২৪ সালে ব্রিস্টলের ফিল্টনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানি এলবিট সিস্টেমসের একটি কারখানায় হামলা ও সম্পদের ক্ষতিসাধনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচার চলাকালীন একজন বিবাদীর বিরুদ্ধে পুলিশ অফিসারকে আঘাত করার অভিযোগও আনা হয়েছিল। তবে মূল বিতর্কের জায়গাটি হলো, বিচারক এখন এই অপরাধগুলোর সাথে ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ আছে কি না, তা নির্ধারণ করবেন। যদি তা প্রমাণিত হয়, তবে সাধারণ দণ্ডবিধির পরিবর্তে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের কঠোর সাজা তাদের ওপর প্রয়োগ করা হবে।
২০২০ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরু করা প্যালেস্টাইন অ্যাকশন গ্রুপটি সরাসরি ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী কৌশল’ (disruptive tactics) অবলম্বনের জন্য পরিচিত। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও সরঞ্জাম তৈরিতে সহায়তাকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করা। এলবিট সিস্টেমস, লিওনার্দো, থালেস এবং টেলেডাইনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্রিটিশ শাখাগুলো তাদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, তারা ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে কর্পোরেট দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে।
২০২৫ সালের ২ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক ভোটাভুটির মাধ্যমে সংগঠনটিকে আল-কায়েদা বা আইএসের মতো সশস্ত্র সংগঠনের কাতারে ফেলে নিষিদ্ধ করা হয়। ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে আইনি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীরা মূলত সম্পদের ক্ষতিসাধন বা প্রতীকি প্রতিবাদের সঙ্গে জড়িত, যা কখনোই ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। যুক্তরাজ্যের বর্তমান আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো সম্পত্তি নষ্ট করা হলে তা ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে লেবেল লাগানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকে দমানোর জন্য এই ধরনের কঠোর আইনি কৌশল গ্রহণ করছে। আদালতে যদি এই কর্মীদের সন্ত্রাসী হিসেবে সাজা দেওয়া হয়, তবে তা যুক্তরাজ্যের বাক-স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের জন্য এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। আল জাজিরার তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে আইনি সাঁড়াশি অভিযান বেড়েছে। এর ফলে কেবল প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সকল ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীরাই এখন রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে রয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, ভবিষ্যতে যদি যেকোনো প্রতিবাদী গোষ্ঠীর কার্যক্রমকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত করে কঠোর দণ্ড দেওয়া হয়, তবে নাগরিক অধিকারের সীমা কতটুকু বজায় থাকবে। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের চার কর্মীর সাজা প্রদানের এই প্রক্রিয়াটি যুক্তরাজ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক প্রভাবের ছাপ রাখছে বলে অনেকে মনে করছেন। আদালতের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে হাজার হাজার মানবাধিকার কর্মী, কারণ এই রায় ভবিষ্যতে ব্রিটিশ প্রতিবাদের ভাষা বদলে দিতে পারে।
