যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১০৯ দিন ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই চুক্তির আওতায় ইরানে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের মধ্যে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির লক্ষ্য হলো একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিনিয়োগ তহবিলের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো অনুদান বা সরাসরি পরিশোধ নয়। বরং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে করা প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর ভিত্তি করে এই তহবিলের কার্যকারিতা নির্ভর করবে। ভ্যান্সের মতে, ইরান যদি আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলে এবং পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর যথাযথ পরিদর্শনের অনুমতি দেয়, তবেই তারা বিশ্ব অর্থনীতির মূলধারায় ফিরে আসতে পারবে। এই প্রক্রিয়াটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জোট দ্বারা অর্থায়ন করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
চুক্তিটিকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে আসছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার কথা রয়েছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দাবির সত্যতা অস্বীকার করা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দাবি করেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট অর্থের ছাড় বা জব্দকৃত সম্পদ আনফ্রিজ করার বিষয়ে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো হয়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি হলো দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যা দীর্ঘমেয়াদী পারমাণবিক চুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। গত কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ফলে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি ১৯৪২ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের কারণে আনুমানিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা তেহরানের সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই অবস্থায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিলের কথাটি সাধারণ মানুষের জন্য একটি আশার আলো হয়ে দেখা দিলেও বিশ্লেষকরা ভিন্নমত পোষণ করছেন।
মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো মুহানাদ সেলুমের মতে, এই বিনিয়োগ তহবিলের ধারণাটি মূলত জব্দকৃত সম্পদ সরাসরি হস্তান্তরের নেতিবাচক ভাবমূর্তি এড়ানোর একটি কৌশল। তার মতে, তেহরান এটিকে এক ধরনের শর্তাধীন এবং তত্ত্বাবধানমূলক সহায়তা হিসেবে দেখছে। ইরানের জন্য এটি একটি সম্মান ও মর্যাদার সংকট হতে পারে, কারণ তারা এটি সরাসরি সার্বভৌম ত্রাণ হিসেবে পাচ্ছে না।
ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে প্রচার করতে চায়। অন্যদিকে, ইরান এই পরিস্থিতিকে তাদের প্রতিরোধের জয় হিসেবে দেখছে। তবে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে এবং ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কতটা অটল থাকতে পারবে, তা কেবল সময়ের ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে চুক্তির খুঁটিনাটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ববাসী।
