ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান অস্থিরতা এবং কর্মসংস্থানের দাবিতে দেশজুড়ে একটি নতুন ও ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের এই সংগঠনটি বর্তমানে দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আল জাজিরা এবং এএফপির তথ্যমতে, ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।
গত মাসে একটি আদালতের শুনানির সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত কর্মসংস্থানহীন তরুণদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সাথে তুলনা করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, তরুণদের একটি অংশ যারা কাজ পায় না, তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে এই মন্তব্যের প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে একটি প্রশ্ন রাখেন, যদি সব তেলাপোকা এক হয়ে যায় তবে কী হবে? এই প্রশ্ন থেকেই সিজেপি আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়।
ভারতের প্রধান মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (এনইইটি)-তে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকার এই পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করার পর কয়েক মিলিয়ন শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এই ঘটনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয় এবং তারা ব্যাপকভাবে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে শুরু করে। সিজেপি কেবল একটি ফেসবুক পেজ থেকে শুরু হলেও বর্তমানে এটি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরছে।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গত ৬ জুন ভারতে ফিরে সরাসরি দিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেন। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই সমাবেশের ডাক দেওয়া হলেও উপস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, সমাবেশে দুই হাজারের কম মানুষ অংশ নেয়, যা অনেকের কাছে প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। তবে আন্দোলনের সমর্থকরা দাবি করছেন, এটি কেবল শুরুর পর্যায় এবং তাদের মূল শক্তি ডিজিটাল পরিসরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপি আন্দোলনের উত্থান ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। এর আগে ২০১২ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে ‘আম আদমি পার্টি’র উত্থান ঘটেছিল, যারা পরবর্তীতে দিল্লির ক্ষমতায় আসীন হয়। সিজেপি সেই ধারার একটি নতুন রূপ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তরুণদের এই সোচ্চার অবস্থান ভারতীয় রাজনীতির জন্য নতুন এক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সরকার বর্তমানে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চাপের মুখে রয়েছে। পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি এখন কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, বরং সাধারণ মানুষের মাঝেও জোরালো হচ্ছে। আন্দোলনের নেতারা বলছেন, তাদের এই যাত্রা এখনই থামছে না। তারা কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অধিকার আদায়ের একটি মূলধারা হতে চায়। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে এই তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ আগামী দিনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
