সোমবার, ০৪ মে, ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়: পতন হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৪, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়: পতন হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের

ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে সোমবার এক বিশাল ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির অন্যতম আলোচিত এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। সোমবার বিকেলের মধ্যে পাওয়া নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৪টি আসনে জয়ী বা এগিয়ে রয়েছে যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮টির ম্যাজিক ফিগার থেকে অনেক বেশি। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৮৩টি আসনে এসে ঠেকেছে। গত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গে এটিই দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই নির্বাচনের ফল কেবল পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দক্ষিণ ভারতের কেরালা এবং তামিলনাড়ুতেও ঘটেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ওলটপালট। তামিলনাড়ুতে দাপুটে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয়ের দল ‘তামিলনাড়ু ভেট্রি কাজাগাম’ বা টিভিকে ১৩০টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে গত ৬০ বছর ধরে চলে আসা ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র দ্বিমেরু রাজনীতির অবসান ঘটল। খোদ মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন তার নিজের আসন কোলাথুরে পরাজিত হয়েছেন যা পুরো ভারতকে চমকে দিয়েছে। অন্যদিকে কেরালায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট ১০২টি আসন পেয়ে জয়ী হয়েছে যার ফলে ভারতে এখন আর কোনো বামপন্থী রাজ্য সরকার অবশিষ্ট রইল না।

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের পেছনে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল যা ছিল মোট ভোটারের প্রায় ১১ শতাংশ। তৃণমূল কংগ্রেস একে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে তার বড় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে যেখানে একসময় মমতার আধিপত্য ছিল সেখানে এবার বিজেপির গেরুয়া ঝড় সব ওলটপালট করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে তৈরি হওয়া জনরোষ এবং উন্নয়নের সুষম বণ্টনের অভাব ভোটারদের বিজেপি অভিমুখে ঠেলে দিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনামলে নারী এবং মুসলিম ভোটাররা ছিলেন তার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো জনমুখী প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে বিজেপি এই জনমুখী প্রকল্পগুলোর বিপরীতে আরও বড় প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। বিশেষ করে উচ্চ হারে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি এবং হিন্দুত্বের মেরুকরণ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে বিজেপি মমতার সুরক্ষিত দুর্গে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে রাঢ় বঙ্গ পর্যন্ত সর্বত্রই বিজেপির বিশাল ভোট প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে।

ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ফলাফলকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলা তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এতদিন বিজেপির কাছে একটি কঠিন দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এবারের জয়ে বিজেপি প্রমাণ করল যে ভারতের উত্তর এবং পশ্চিমের পর এবার পূর্বেও তারা অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ জয় করলেও বিজেপির জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজ্যের বিশাল বেকারত্ব সমস্যা সমাধান এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে শাসন পরিচালনা করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।

কেরালা ও তামিলনাড়ুর ফলাফলও ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বামপন্থীদের এই বিপর্যয় ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের এই অবিশ্বাস্য জয় প্রমাণ করেছে যে ভারতের রাজনীতিতে এখনো সিনেমার প্রভাব এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু শক্তিশালী হতে পারে। সোমবারের এই সামগ্রিক ফলাফল কেবল কয়েকটি রাজ্যের ক্ষমতা বদল নয় বরং এটি ভারতের ২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তার সংকেত হিসেবে কাজ করবে।

banner
Link copied!