ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক ধাপের ভোটগ্রহণ শেষে এখন চূড়ান্ত ফলাফলের অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব। সোমবার সকাল থেকেই শুরু হচ্ছে এই মেগা-থ্রিলারের ভোট গণনা। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস—এই দুই শিবিরের মধ্যেই লড়াইটি সীমাবদ্ধ থাকলেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সোমবার সকাল ৮টা থেকে রাজ্যের ৭৭টি গণনা কেন্দ্রে একযোগে ভোট গণনা শুরু হবে। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং পরে ইভিএমের মাধ্যমে জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সোমবার দুপুরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে আগামী পাঁচ বছর কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কার পতাকা উড়বে।
বিগত কয়েক দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। তৃণমূল ও বিজেপির নেতা-কর্মীরা স্ট্রং রুমের বাইরে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। ইভিএম কারচুপির আশঙ্কা থেকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে প্রতিটি গণনা কেন্দ্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছেন যেন একটি ভোটও খোয়া না যায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস থেকে পুরো পরিস্থিতি ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, বিজেপি এবার পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মাঠে নেমেছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গে জয়লাভের বিষয়টিকে প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে দেখছেন। বিজেপি শিবিরের দাবি, এবার হিন্দু মধ্যবিত্ত ভোটারের রায় তাদের দিকেই ঝুঁকবে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় প্রকল্পগুলোর সুফল—কোনটি ভোটারদের বেশি প্রভাবিত করবে। অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া এবং সি ভোটারের মতো প্রথম সারির সমীক্ষক সংস্থাগুলোও এবার নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দিতে পারছে না। সমীকরণে নারী ভোটার এবং সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মমতার লক্ষ্য হলো ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’ আবেগ কাজে লাগিয়ে দুর্গ রক্ষা করা। অন্যদিকে বিজেপির বাজি হলো ‘মোদি ম্যাজিক’ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের সরব আন্দোলন। পশ্চিমবঙ্গের এই ফলাফল ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মজার বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন কেবল ভারতের সীমানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাছেও এটি এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। এপার বাংলার মানুষের চোখ এখন ওপার বাংলার ফলাফলের দিকে। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কের কারণেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জয়-পরাজয় নিয়ে এত আগ্রহ। কলকাতার টেলিভিশন চ্যানেলগুলো থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়া—সবখানেই এখন কেবল ফলাফল নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে। এই লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন করেছে। গণনা কেন্দ্রের গণ্ডির বাইরে রাজনৈতিক সংঘর্ষ এড়াতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বিজেপি তাদের কর্মীদের মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূল তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গণনাকেন্দ্রের প্রতিটি ইঞ্চি পাহারা দিচ্ছে। এই নির্বাচন কেবল একটি জয়-পরাজয়ের লড়াই নয়, এটি ভারতীয় রাজনীতির মেরুকরণের এক বড় পরীক্ষা। সোমবারের ফলাফলই বলে দেবে পশ্চিমবঙ্গের মাটি মমতার প্রতি অনুগত থাকবে নাকি মোদির পরিবর্তনের ডাক বাস্তবায়িত হবে।
