যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল এবং সারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠলেও এর প্রকৃত প্রভাব এখনো সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তবে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন যে, আগামী কয়েক মাস বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। মূলত কৃষি উপকরণের বর্ধিত মূল্য এবং খুচরা বাজারে পণ্যের দামের মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান থাকে, তার কারণেই এই ধাক্কাটি আসতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, খাদ্য সংকটের তীব্রতা তত বাড়বে। উল্লেখ্য যে, এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক সার এবং এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়।
জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মতিন কাইম আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে, আগামী মাসগুলোতে খাদ্যের দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে। এর ফলে বিশ্বের বহু মানুষের জন্য পর্যাপ্ত এবং পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন যে, এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের আয়ের একটি বিশাল অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করতে হয়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা ও অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মহান আল্লাহ মানুষকে ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করার যে কথা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই প্রতিফলন। (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাউ) গত সপ্তাহে সতর্ক করে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে তবে বিশ্ব এক মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। সংস্থাটির মতে, এই ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া, তানজানিয়া এবং মিশর। গত মাসে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি এই যুদ্ধ বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত গড়ায় এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে অতিরিক্ত ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে। বর্তমানে তেলের বাজারের অস্থিরতা সরাসরি চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে।
এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য সূচক গত মাসের তুলনায় ২.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য এখনো সহনীয় মনে হতে পারে। তবে নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি নীতি বিশেষজ্ঞ স্যান্ড্রো স্টেইনবাখ মনে করেন, এই স্থিতিশীলতা কেবল সাময়িক। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, সারের উচ্চমূল্য এবং জাহাজ চলাচলের সংকট কয়েক দিনের মধ্যে প্রভাব ফেললেও কৃষির ফলন আসতে কয়েক মাস সময় লাগে। এছাড়া দরিদ্র দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই খাদ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়। ফলে ঢাকা, কায়রো বা ল্যাগোসের মতো শহরগুলোতে ইতিমধ্যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দিলে সংকট কাটবে না। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে গম ও ভুট্টার দাম বছরের শেষ নাগাদ ৪ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালের খাদ্য সংকটের সময় ভারত ও চীনসহ অনেক দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিলেও এবার এখনো তেমন কোনো গণ-নিষেধাজ্ঞা দেখা যায়নি। তবে ইরান ও কুয়েত ইতিমধ্যে কিছু কড়াকড়ি আরোপ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর পক্ষে নন। এই রাজনৈতিক অনড়তা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের ফলে শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ওপর অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে বলে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
