ভলোদিমির জেলেনস্কির শৈল্পিক দক্ষতা তাকে বিশ্বরাজনীতিতে এক পাবলিক রিলেশন বা জনসংযোগ প্রতিভা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বন্ধু হোক কিংবা শত্রু, এই সত্য মেনে নেন সবাই। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে `পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিক্রেতা` বলে উপহাস করলেও, নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ডেভিড ফ্রেঞ্চ তাকে মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতা হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন। কিন্তু জনসংযোগের এই জাদুকরী ক্ষমতা রণক্ষেত্রের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে খুব কমই ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এসে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তা কিয়েভের জন্য ক্রমেই এক অন্ধকার গলিতে পরিণত হচ্ছে। জেলেনস্কি প্রশাসন এবং তার মিত্ররা যুদ্ধের মোড় ঘোরার জোরালো দাবি করলেও মাটির বাস্তব চিত্র এক ভিন্ন করুণ কাহিনি বলছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন রাশিয়ার চেয়ে বেশি অঞ্চল পুনর্দখল করার দাবি করলেও ফরাসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো সেই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আসলে ফ্রন্টলাইনের বিশাল ধূসর অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। প্রতি মাসে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর যে গাণিতিক পদ্ধতি, তা অনেক সময়ই কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের জন্য হেরফের করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত দুই বছরে যুদ্ধের মৌলিক গতিপ্রকৃতিতে ইউক্রেনের পক্ষে কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে রাশিয়ার সেনারা দোনেৎস্ক অঞ্চলের উত্তর দিকে অবস্থিত বেশ কিছু শিল্পনগরী অবরোধ করে রেখেছে। উত্তরের সীমান্ত বরাবর তাদের এই অগ্রযাত্রা সক্রিয় ফ্রন্টলাইনকে আরও শত শত কিলোমিটার বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ইউক্রেনের সেনাসংখ্যা বা পারসোনেল ঘাটতি এখন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের চার বছর পর ইউক্রেনীয় বাহিনীকে এখন বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাট থেকে তরুণদের তুলে এনে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণের টোপ দিয়ে প্রতিনিয়ত বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে চলেছে।
জেলেনস্কি দাবি করেছেন যে, রাশিয়া তাদের সেনা রিক্রুটের চেয়ে বেশি লোক হারাচ্ছে। এমনকি গত মার্চে রুশ সেনাদের ৩ হাজার ৫০০ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু জেলেনস্কির এই বক্তব্য খোদ তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সাথেই সাংঘর্ষিক। মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রুশ বাহিনীর মাসিক ক্ষয়ক্ষতি ছিল ৪৮ হাজার এবং পুরো বছর জুড়েই এই গড় ছিল ৩৫ হাজার। জেলেনস্কির চিফ অফ স্টাফ এবং সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভও এই বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন সুর দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, রাশিয়ার নতুন সেনা সমাবেশের প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ এখনই দেখা যাচ্ছে না। এখানে লক্ষণীয় যে, ইউক্রেন ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার তেলের ডিপোগুলোতে সফল হামলা চালালেও তা কেবল টেলিভিশনের খবরের জন্য নাটকীয় ফুটেজ ছাড়া আর কিছু দিতে পারছে না।
রাশিয়ার অর্থনীতির শক্তিমত্তা বর্তমানে কিয়েভের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিলে রাশিয়ার তেলের আয় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেলের বাজারে যে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে, তা মস্কোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। রাশিয়ার এই এক মাসের আয় ইউক্রেনকে পরবর্তী দুই বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেওয়া ৯০০ কোটি ইউরো ঋণের প্রায় ১০ শতাংশের সমান। পুতিন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা স্বীকার করলেও, আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চার্ট বলছে ভিন্ন কথা। রাশিয়ার ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী মাথাপিছু জিডিপি বর্তমানে রোমানিয়া বা গ্রিসের মতো ইইউভুক্ত দেশের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে ইউক্রেনের অবস্থান এখন মঙ্গোলিয়া বা মিসরের সমপর্যায়ভুক্ত। দেশটির অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং লাখ লাখ ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন যাদের ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ যখন অত্যন্ত ধূসর, তখন পশ্চিমা মিত্ররা তলে তলে ইউক্রেনকে এক `বেদনাদায়ক শান্তি` চুক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সম্প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিতে হতে পারে। এর বিনিময়ে দ্রুত ইইউ সদস্যপদ পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা প্রধান আন্দ্রিয়াস কুবিলিয়াস সরাসরি বলেছেন যে, ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না এবং ইইউ সদস্যপদ পাওয়াও এক অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া হবে। তিনি ইউক্রেনকে নিয়ে একটি পৃথক `ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ইউনিয়ন` গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মস্কো ন্যাটোতে প্রবেশের পিছনের দরজা হিসেবেই দেখবে। এখন আসল দরকষাকষি জেলেনস্কি আর পুতিনের মধ্যে নয়, বরং জেলেনস্কি আর তার পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে চলছে। জেলেনস্কি ইউক্রেনের মানুষের সামনে এমন কোনো অর্জন দেখাতে পারছেন না যা এই কঠিন শান্তির বিনিময়ে দেওয়া যায়।
জেলেনস্কির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানও এখন নড়বড়ে। তার ঘনিষ্ঠ মহলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত তাকে জনসমক্ষে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে তার সাবেক উপদেষ্টা আন্দ্রি ইয়ারমাক জ্বালানি খাতের দুর্নীতির দায়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ার পর জেলেনস্কির জনপ্রিয়তায় ধস নামে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে পড়েন তিনি। বর্তমানে জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে বা তার পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে খেলার মতো আর কোনো শক্তিশালী তাস বা কার্ড হাতে রাখছেন না। তিনি একজন যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে নিজের পদ টিকিয়ে রাখলেও পরিস্থিতির মোড় যে ইউক্রেনের প্রতিকূলে চলে গেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ইউক্রেন এখন স্রেফ একটি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার বা মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে দেশটির সংসদীয় কমিটির প্রধান দানিলো হেটমানৎসেভ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যুদ্ধের চার বছর পর এই দীর্ঘশ্বাস আর কতদিন জেলেনস্কিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
