ইরানের সাধারণ মানুষ এখন এক গভীর `ডিজিটাল অন্ধকার`-এর মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর থেকেই দেশটির ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। এই দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্নতা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম। তবে এই অন্ধকারের মধ্যেই আলোর পথ খুঁজছে একটি গোপন নেটওয়ার্ক। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানির স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ডিভাইস ইরানে পাচার করছে।
সাহান্দ (পরিবর্তিত নাম) নামের এক ইরানি নাগরিক এই নেটওয়ার্কের একজন সক্রিয় সদস্য। বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, তেহরান সরকারের কড়া নজরদারি এড়াতে অত্যন্ত গোপনে তারা এই কাজ পরিচালনা করছেন। সাহান্দের ভাষায়, যদি একজন মানুষও স্টারলিংকের মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সাথে যুক্ত হতে পারে, তবে তাদের এই প্রচেষ্টা সফল। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কঠোর শাস্তির ভয়। সাহান্দ যখন কথা বলছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল গভীর উদ্বেগ। কারণ ইরানে তার পরিবার ও পরিচিতরা এখনো রয়ে গেছেন। যদি সরকার তাকে শনাক্ত করতে পারে, তবে তার আত্মীয়দের চরম মূল্য দিতে হবে।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার গত কয়েক মাস ধরে ইন্টারনেটকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নজিরবিহীন কঠোরতা অবলম্বন করছে। বিশেষ করে জানুয়ারিতে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক সহিংসতার পর থেকেই এই ব্ল্যাকআউট জোরদার করা হয়। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) বা এইচআরএএনএ-এর তথ্যমতে, গত জানুয়ারির বিক্ষোভে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ৫৩ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক হতাহতের তথ্য যেন বহির্বিশ্বে না পৌঁছাতে পারে, সেজন্যই সরকার ইন্টারনেট বন্ধের পথ বেছে নিয়েছে।
স্টারলিংক ডিভাইসগুলো বর্তমানে ইরানিদের জন্য একমাত্র বিশ্বস্ত জানালার মতো কাজ করছে। এই সাদা রঙের ফ্ল্যাট টার্মিনালগুলো যখন রাউটারের সাথে সংযুক্ত হয়, তখন তা সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহ করে। এতে করে ইরানের অভ্যন্তরীণ কঠোর নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা বা গেটওয়ের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সাহান্দের মতো পাচারকারীরা এই ডিভাইসগুলো কিনে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইরানে প্রবেশ করান। সাহান্দ জানিয়েছেন, জানুয়ারি থেকে তিনি নিজে এক ডজন ডিভাইস পাঠিয়েছেন এবং বর্তমানে আরও অনেক ডিভাইস পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তবে এই অভিযান মোটেও সহজ নয়। ইরান সরকার স্টারলিংক ব্যবহার বা বিক্রির বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর আইন পাস করেছে। গত বছর পাস হওয়া একটি আইন অনুযায়ী, স্টারলিংক ডিভাইস ব্যবহারকারী বা বিক্রেতার দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আর কেউ যদি ১০টির বেশি ডিভাইস আমদানি বা বিতরণ করে, তবে তার ১০ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে এর চেয়েও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সম্প্রতি চার ব্যক্তিকে স্টারলিংক পাচারের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে দুইজন বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ মানুষ যখন ব্যাংকিং বা দৈনন্দিন কাজে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। তারা `হোয়াইট সিম কার্ড` নামক এক বিশেষ সংযোগ ব্যবহার করে কোনো বাধা ছাড়াই বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন। এটি ইরানের ইন্টারনেট ব্যবস্থার এক বড় বৈষম্য। সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট যেখানে বিলাসিতা বা নিষিদ্ধ বস্তু, সেখানে শাসকগোষ্ঠীর জন্য তা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
এই ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও কিন্তু কিছু তথ্য বাইরে আসছে। বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গুলি চালানো বা সাধারণ মানুষকে মারধরের ভিডিওগুলো যে কয়েকটি উৎস থেকে বাইরে এসেছে, তার বড় একটি অংশই স্টারলিংক সংযোগের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। উইটনেস নামক একটি মানবাধিকার সংস্থার মতে, ইরানে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল সক্রিয় রয়েছে। তবে এই সংখ্যা এখন দ্রুত বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্টারলিংক পাচারের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামের `ন্যাসনেট` (NasNet) নামক একটি চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। গত আড়াই বছরে এই চ্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ডিভাইস বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সরকার এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেক্টর ব্যবহার করে স্টারলিংক ডিশগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। এই বিপদমুক্ত থাকতে পাচারকারীরা এখন ব্যবহারকারীদের ভিপিএন (VPN) ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানে সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্টারলিংক ডিভাইস কেনা এবং তার মাসিক চার্জ পরিশোধ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াইটি শুধু ইন্টারনেটের নয়, এটি তথ্যের স্বাধীনতার লড়াই। সাহান্দের মতো শত শত মানুষ এই গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়ছেন যেন ইরানের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ না হয়ে যায়। যতদিন এই ডিজিটাল অন্ধকার বজায় থাকবে, ততদিন এই গোপন সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ডিশগুলোই হবে ইরানিদের প্রতিবাদের ভাষা।
