মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩

টোকিওর এক আজব মন্দির, যেখানে মানুষ যায় কনসার্টের টিকিটের জন্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৫, ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

টোকিওর এক আজব মন্দির, যেখানে মানুষ যায় কনসার্টের টিকিটের জন্য

টোকিওর নিহোনবাশি জেলা এক ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানে স্যুট-বুট পরা কর্মকর্তাদের ভিড়, নামী দামী বিপণিবিতান আর আকাশচুম্বী দালানগুলোর নিচে সূর্যের আলোও যেন হার মানতে চায়। কিন্তু এই আধুনিকতার ভিড় ঠেলে একটি উজ্জ্বল লাল রঙের তোঁরি বা গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলেই এক অন্য জগতের দেখা মেলে। এটি ফুকুতোঁকু মন্দির, যা প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এক শান্ত ও আধ্যাত্মিক মরুদ্যান। বিবিসি নিউজের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে এই প্রাচীন মন্দিরটি বর্তমান সময়ের জে-পপ ও কে-পপ ভক্তদের কাছে এক বিশেষ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এখানকার দেবতারা সুস্বাস্থ্য বা ধন-সম্পদের চেয়েও এখন বেশি পরিচিত প্রিয় ব্যান্ডের কনসার্টের টিকিট পাইয়ে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতার জন্য।

নবম শতাব্দীতে নির্মিত এই মন্দিরটি মূলত উৎসর্গ করা হয়েছিল ইনারি দেবতাকে, যিনি সমৃদ্ধি এবং ভালো ফসলের আশীর্বাদদাতা হিসেবে জাপানিদের কাছে পূজনীয়। ১৫৯০ সালে প্রখ্যাত সামুরাই তোকুগাওয়া ইয়েয়াসু এই মন্দিরটি পরিদর্শন করেন এবং এর শান্ত পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে এর পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করেন। সেই সময় থেকেই মন্দিরটি বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করত, যার মধ্যে অন্যতম ছিল লটারি আয়োজনের অনুমতি। ওহিও‍‍`র কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক বেথ কার্টার জানান যে এই লটারির অর্থ দিয়ে মন্দিরের উন্নয়ন করা হতো এবং বিজয়ীরাও মোটা অঙ্কের পুরস্কার পেতেন। সেই থেকেই ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর জন্য ফুকুতোঁকু মন্দিরের এক বিশেষ খ্যাতি তৈরি হয় যা শত শত বছর ধরে জাপানিদের বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে জাপানে যখন জে-পপ বা জাপানিজ পপ মিউজিকের জোয়ার আসে, তখন এই মন্দিরের মাহাত্ম্য এক নতুন মাত্রা পায়। গ্লে, স্পিড কিংবা মর্নিং মুসুমে-এর মতো ব্যান্ডগুলোর জন্য ভক্তদের উন্মাদনা এতটাই বেড়ে যায় যে জাপানে ‘ওশি’ (oshi) নামক এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়। ওশি বলতে বোঝায় সেই নির্দিষ্ট শিল্পী বা ব্যান্ডের সদস্যকে, যাকে ভক্তরা অন্ধভাবে অনুসরণ করেন। টোকিও ভিত্তিক নিউজ সাইট সোরানিউজ২৪-এর প্রতিবেদক ক্রিস্টা রজার্স বলেন যে এই ওশি সংস্কৃতি জাপানিদের জীবনযাত্রার সাথে মিশে গেছে। ভক্তরা তাদের প্রিয় শিল্পীর নাম সম্বলিত টি-শার্ট, ব্যাগ বা ব্যাজ কিনলেও সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন কনসার্টের টিকিট নিয়ে। কারণ জাপানের বড় কনসার্টগুলোর টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং তা লটারির ওপর নির্ভরশীল।

জাপানে টিকিট কেনার এই অনলাইন লটারি পদ্ধতিতে ভক্তরা আবেদন করেন এবং লটারিতে নাম উঠলেই কেবল তারা নির্দিষ্ট সংখ্যক টিকিট কেনার সুযোগ পান। ফলে অনেক ক্ষেত্রে অর্থ থাকলেও ভাগ্যের সহায়তা ছাড়া প্রিয় শিল্পীকে কাছ থেকে দেখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ঠিক এই জায়গাটিতেই ফুকুতোঁকু মন্দিরের গুরুত্ব ভক্তদের কাছে বেড়ে গেছে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে এই মন্দিরে প্রার্থনা করলে লটারিতে জেতার সম্ভাবনা বাড়ে। টোকিও ভিত্তিক গাইড সাইবার বানির মতে জাপানিদের মধ্যে একটি কথা প্রচলিত আছে যে নিজের সবটুকু চেষ্টা করার পর বাকিটা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দাও। ভক্তরা মনে করেন টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র এক শতাংশ বাড়লেও তারা এই মন্দিরে প্রার্থনা করবেন কারণ এটি না করার চেয়ে অনেক ভালো।

করোনা মহামারীর সময় দীর্ঘ দুই বছর জাপানে সব ধরনের কনসার্ট বন্ধ ছিল। তবে ২০২২ সালে যখন বিধিনিষেধ উঠে যায় এবং প্রিয় ব্যান্ডগুলো আবার কনসার্ট শুরু করে, তখন এই মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। আরিগাতো ট্রাভেলের গাইড উলি নাম্বো জানান যে সেই সময় ভিড় এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মন্দিরের সামনের রাস্তাটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। এখন প্রতিদিন শত শত তরুণ-তরুণী এখানে এসে হাত-মুখ পরিষ্কার করে দেবতার সামনে প্রার্থনা করেন। পাঁচ থেকে দশ ডলার খরচ করে তারা ‘এমা’ নামক ছোট কাঠের কার্ড কেনেন এবং সেখানে প্রিয় ব্যান্ডের নাম যেমন বিটিএস কিংবা জিরোবেসওয়ান-এর কনসার্টের টিকিট পাওয়ার আকুতি লিখে ঝুলিয়ে দেন।

এই আধ্যাত্মিক চর্চাটি কি নিছক জাগতিক চাহিদা পূরণ নাকি এর গভীরে অন্য কোনো দর্শন রয়েছে—তা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে অধ্যাপক বেথ কার্টারের মতে এটিকে কেবল বস্তুবাদী চাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এই ধর্মীয় আচার এবং প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে ভক্তরা যে মানসিক প্রশান্তি বা একাত্মবোধ খুঁজে পান তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন কেউ তার পছন্দের কোনো জিনিস অর্জন করে, তখন তার মধ্যে যে আনন্দ ও প্রশান্তি তৈরি হয় তা তাকে আধ্যাত্মিক বিনিময়ের জন্য আরও উপযুক্ত করে তোলে। ফুকুতোঁকু মন্দির তাই কেবল লটারির টিকিট জেতার জায়গা নয়, বরং এটি আধুনিক টোকিওর যান্ত্রিক জীবনের মাঝে ভক্তদের আবেগ ও বিশ্বাসের এক প্রাচীন সংযোগস্থল।

banner
Link copied!