মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩

ইউরোপীয় গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপের হুমকি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৫, ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

ইউরোপীয় গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপের হুমকি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) তৈরি গাড়ি ও ট্রাকের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে একলাফে ২৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর স্বাক্ষরিত একটি বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পূরণে ব্রাসেলস কালক্ষেপণ করছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে আটলান্টিকের দুই পাড়ের দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে একটি বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের ইরান নীতিতে ইইউ-এর সরাসরি অসম্মতির কারণে মিত্রদের মধ্যে আগে থেকেই এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান যে আগামী সপ্তাহ থেকে ইউরোপীয় গাড়ির ওপর বর্ধিত এই শুল্ক কার্যকর করা হবে। তিনি সরাসরি দাবি করেন, ইইউ তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাণিজ্য চুক্তিটি মেনে চলছে না। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি শর্তও জুড়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে যেসব ইউরোপীয় কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কারখানা স্থাপন করে গাড়ি ও ট্রাক তৈরি করবে, তাদের কোনো মার্কিন ইইউ গাড়ি শুল্ক দিতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল খাতে বর্তমানে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে জানিয়ে ট্রাম্প এটিকে আমেরিকার শিল্প খাতের এক ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

বর্তমান এই বাণিজ্য বিতর্কের মূলে রয়েছে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে স্কটল্যান্ডে স্বাক্ষরিত ‍‍`টার্নবেরি চুক্তি‍‍`। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের মধ্যে হওয়া সেই রাজনৈতিক চুক্তিতে ইইউ-এর অটোমোবাইলসহ বেশিরভাগ পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৫ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর বিনিময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম এবং জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ইইউ-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ শুল্ক সীমার ওই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল।

তবে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আটলান্টিকের উভয় প্রান্তেই আইনি ও রাজনৈতিক বাধার সৃষ্টি হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিলে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেন। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের একতরফা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জরুরি শুল্ক নীতিকে বেআইনি ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারার অধীনে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নতুন করে শুল্ক আরোপের আইনি পথ খুঁজতে হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই শুল্ক বৃদ্ধির হুমকির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় নেতৃত্ব। মঙ্গলবার আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে এক সংবাদ সম্মেলনে উরসুলা ফন ডার লিয়েন ট্রাম্পের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, "চুক্তি মানে চুক্তি, এবং আমাদের মধ্যে একটি কার্যকর চুক্তি রয়েছে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চুক্তির শর্ত মেনেই কাজ করছে এবং তারা ওয়াশিংটনের কাছ থেকেও একই ধরনের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে ইইউ-এর ‍‍`অ্যান্টি-কোয়ার্শন‍‍` বা জবরদস্তিবিরোধী আইনি হাতিয়ার ব্যবহারের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এ ধরনের অর্থনৈতিক হুমকির মুখে ইউরোপের উচিত নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করা।এই শুল্ক বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে ইউরোপের গাড়ি শিল্প, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জার্মানি। কার সেলস স্ট্যাটিস্টিকস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভক্সওয়াগন, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ, পোরশে এবং অডির মতো জার্মান ব্র্যান্ডগুলোর প্রায় ৭.৫ শতাংশ বাজার দখল রয়েছে। এসব কোম্পানি প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ১২ লাখ হালকা যান বিক্রি করে থাকে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইইউ-এর ৪০.৮ বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ ইতিমধ্যেই ইইউ সদস্য দেশগুলোর প্রতি দ্রুত চুক্তির অনুমোদন সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। এই ২৫ শতাংশ মার্কিন ইইউ গাড়ি শুল্ক সত্যিই কার্যকর হলে তা বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।

banner
Link copied!