মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩

রেকর্ড ৮০০ কোটি ডলার উত্তরাধিকার কর দিল স্যামসাং পরিবার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৫, ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

রেকর্ড ৮০০ কোটি ডলার উত্তরাধিকার কর দিল স্যামসাং পরিবার

দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়িক জায়ান্ট স্যামসাং গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিবার তাদের দীর্ঘ পাঁচ বছরের কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রয়াত চেয়ারম্যান লি কুন-হি-র রেখে যাওয়া বিশাল সম্পদের ওপর নির্ধারিত ১২ ট্রিলিয়ন উওন বা প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলারের উত্তরাধিকার কর পরিশোধের বিষয়টি সোমবার নিশ্চিত করেছে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ার কর্পোরেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম কর নিষ্পত্তির উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান লি জায়ে-ইয়ং এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ২০২১ সাল থেকে শুরু করে ছয়টি পৃথক কিস্তিতে এই কর পরিশোধ করেছেন।

ঘটনার শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে যখন স্যামসাংকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করা কিংবদন্তি চেয়ারম্যান লি কুন-হি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন উওন মূল্যের সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন যার মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট এবং দামী শিল্পকর্মের সংগ্রহ ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী এই সম্পদের ওপর ৫০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। উল্লেখ্য যে দক্ষিণ কোরিয়ার উত্তরাধিকার করের হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ যা নিয়ে দেশটির ব্যবসায়িক মহলে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক চলে আসছে। স্যামসাং পরিবার জানিয়েছে যে সময়মতো কর পরিশোধ করা একজন নাগরিকের মৌলিক দায়িত্ব এবং তারা আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেই এই প্রক্রিয়া শেষ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে এই কর পরিশোধের প্রক্রিয়াটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন ছিল না বরং এটি ছিল স্যামসাংয়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একটি কৌশলগত লড়াই। পরিবারের প্রধান উত্তরসূরি লি জায়ে-ইয়ং তার ব্যক্তিগত শেয়ার বিক্রি না করেই লভ্যাংশ এবং ঋণের মাধ্যমে নিজের অংশের কর পরিশোধ করেছেন যাতে কোম্পানির ওপর তার কর্তৃত্ব বজায় থাকে। অন্যদিকে তার মা হং রা-হি এবং দুই বোন লি বু-জিন ও লি সিও-হিউন তাদের অংশের কর মেটাতে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করেছেন। ২০২৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার যে পরিমাণ মোট উত্তরাধিকার কর রাজস্ব সংগ্রহ করেছে এই পরিবারের দেওয়া এককালীন করের পরিমাণ ছিল তার প্রায় দেড় গুণ।

কর পরিশোধের পাশাপাশি লি পরিবার সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দানও করেছে। প্রয়াত চেয়ারম্যানের সংগ্রহে থাকা পাবলো পিকাসো এবং সালভাদর দালির মতো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা প্রায় ২৩ হাজার শিল্পকর্ম ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ কোরিয়া এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংস্থায় দান করা হয়েছে। এছাড়া পরিবারটি একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৭০০ বিলিয়ন উওন প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এই পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ৪৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত সেমিকন্ডাক্টর চিপের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত এক বছরে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে যা তাদের এই বিশাল করের বোঝা সামলাতে সাহায্য করেছে।

১৯৩৮ সালে লি বিয়ং-চুল যখন একটি ছোট ট্রেডিং ফার্ম হিসেবে স্যামসাং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন হয়তো কেউ ভাবেনি যে এটি একদিন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। বর্তমানে স্যামসাং কেবল ইলেকট্রনিক্স নয় বরং নির্মাণ, বীমা এবং আর্থিক সেবা খাতের অন্যতম প্রধান শক্তি। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের এই সফল কর নিষ্পত্তির মাধ্যমে স্যামসাংয়ের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটল বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। দক্ষিণ কোরিয়ার এই ‍‍`চেবল‍‍` বা পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যবসায়িক কাঠামোর ভবিষ্যৎ এখন লি জায়ে-ইয়ংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর ওপর নির্ভর করছে।

banner
Link copied!