২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে আফ্রিকান ফুটবল ভক্তদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর ভিসা নীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (সিএএফ) এবং ফিফার নীরবতা নিয়ে ক্রীড়া বিশ্লেষক ও ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। গত ৫ মে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই বৈষম্যমূলক নীতির ফলে আফ্রিকান দেশগুলোর সাধারণ ভক্তদের স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগ হারানোর আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। অথচ সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে `ফিফা পিস প্রাইজ` প্রদান করে ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেনেগাল এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশের ভক্তরা সরাসরি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার (Travel Ban) কবলে পড়েছেন। যদিও খেলোয়াড়, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট স্টাফরা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবেন, কিন্তু সাধারণ ভক্তদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। এছাড়া আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাবো ভার্দে-র মতো দেশগুলোর জন্য ১৫ হাজার ডলার বা প্রায় ১৮ লাখ টাকার `ভিসা বন্ড` বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিউনিসিয়ার মতো দেশে যেখানে মাথাপিছু বার্ষিক আয় মাত্র ৫০০ ডলারের কিছু বেশি, সেখানে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা দিয়ে ভিসা সংগ্রহ করা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব।
ঐতিহাসিকভাবে আফ্রিকান ফুটবলের নীতি ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। ১৯৬৪ সালে যখন ফিফা আফ্রিকা ও এশিয়ার জন্য মাত্র একটি স্লট বরাদ্দ করেছিল, তখন ঘানার তৎকালীন ক্রীড়া পরিচালক ওহেনে জান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এর ফলে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো দল অংশ নেয়নি। সেই সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে আজ আফ্রিকা থেকে ৯টি দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ বর্তমান সিএএফ নেতৃত্ব তাদের পূর্বসূরিদের সেই বিপ্লবী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবল ফিফার রাজস্ব কাঠামোর অংশ হয়ে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে যে সিএএফ অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল, আজ সেই সংস্থাটিই মার্কিন বৈষম্যের মুখে টু শব্দ করছে না।
প্রতক্ষদর্শীরা মনে করছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূতের বহিষ্কার এবং বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের বর্ণবাদী মন্তব্য ফুটবল ও রাজনীতির নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সিএএফ চাইলেই দাবি করতে পারত যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর ম্যাচগুলো কানাডা বা মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়া হোক, যেখানে ভিসা নীতি অপেক্ষাকৃত শিথিল। অথবা তারা ফিফার এথিক্স কমিটিতে নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ তুলতে পারত। কিন্তু ফিফার ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে সিএএফ সভাপতি প্যাট্রিস মোৎসেপে নীরব থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন। এই নীরবতা প্রকারান্তরে আফ্রিকার সাধারণ মানুষের অধিকারকে বিসর্জন দেওয়ার শামিল।
আগামী দিনে এই সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্যালারিতে আফ্রিকান ভক্তদের উপস্থিতি হবে নগণ্য। এটি কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি মহাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশনগুলো যদি এখনই সরব না হয়, তবে বৈশ্বিক ফুটবলে বৈষম্যের এই নতুন রূপ স্থায়ী রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ফিফা যদি সত্যিই `সকলের খেলা` ফুটবলকে বিশ্বজনীন করতে চায়, তবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ভক্তদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
