শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই: দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহের কারণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ০৮:০৮ পিএম

তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছুঁইছুঁই: দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহের কারণ

দক্ষিণ এশিয়ার বিশাল জনপদ এখন এক অবর্ণনীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এমন এক রেকর্ড ভাঙা দাবদাহের কবলে পড়েছেন, যা এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। তাপমাত্রার পারদ অনেক জায়গায় ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে, যা জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে কেবল একটি সাধারণ গ্রীষ্মকালীন গরম হিসেবে দেখছেন না, বরং একে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ভয়াবহ ফলাফল হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ‘মরণফাঁদ’ দাবদাহের পেছনের অন্ধকার সত্যগুলো।

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচিতে গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ জন মানুষ তাপজনিত জটিলতায় মারা গেছেন। করাচিতে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০১৮ সালের পর শহরটির জন্য সর্বোচ্চ। পাকিস্তানের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে যে করাচি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে লোডশেডিং এবং পানীয় জলের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। করাচির ইধি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে উদ্ধারকৃত মরদেহের অনেকেরই শরীরে হিটস্ট্রোকের লক্ষণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দাবদাহের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকজন স্কুল শিক্ষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দেশটির অনেক রাজ্যে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে, যার ফলে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

এই চরম তাপপ্রবাহের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে জলবায়ু পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ৩০ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের প্রাক-মৌসুম গরম এখন অনেক আগে শুরু হচ্ছে এবং এর স্থায়িত্বকাল অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ‘এল নিনো’র প্রভাব এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণায়ন ২০২৬ সালকে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম উষ্ণতম বছরে পরিণত করার পথে রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মেগাসিটিগুলো যেমন দিল্লি, ঢাকা এবং মুম্বাই এখন ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবে ভুগছে। উঁচু দালানকোঠা এবং গাছপালাহীন কংক্রিটের জঙ্গল দিনের বেলা প্রচণ্ড তাপ শোষণ করে রাখে এবং রাতেও তা ঠান্ডা হয় না, ফলে মানুষের শরীর বিশ্রামের সুযোগ পায় না।

দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এই তাপপ্রবাহের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কৃষি খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের শস্য উৎপাদন ৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গম ও ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকরা রোদে পুড়ে কাজ করতে পারছেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে সেচের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবেও এই অঞ্চল বড় ক্ষতির মুখে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র গরমে প্রতি বছর শত শত কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক এবং দিনমজুররা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি অসহায়।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই দাবদাহ কেবল শুরু। দক্ষিণ এশিয়ার মেগাসিটিগুলোতে ভবিষ্যতে বছরের অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ দিন অসহনীয় গরম থাকতে পারে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (WMO) এর তথ্যমতে, এশিয়া বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২৪ সালের এক দাবদাহে ৩৩ মিলিয়ন মানুষের আক্রান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এবারের ২০২৬ সালের মে মাসের এই রেকর্ড পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে কেবল সাময়িক সতর্কবার্তা বা স্কুল ছুটি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নগরায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা, প্রচুর গাছ লাগানো এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগে শামিল হওয়া এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দাবদাহ কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি মানবসৃষ্ট সংকটের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই অঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হলেও তারাই এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন। ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনাহীন নগরায়ন আজ দক্ষিণ এশিয়াকে একটি উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত করেছে। যদি এখনই দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে সামনের বছরগুলোতে এই ‘ক্যাল্যামিটি’ বা মহামারি সদৃশ দাবদাহ আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। করাচি থেকে কলকাতা কিংবা ঢাকা থেকে দিল্লি—সবখানেই এখন একই আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে, যা মূলত পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট করারই এক করুণ পরিণতি।

banner
Link copied!