রাশিয়ার দক্ষিণ উপকূলের আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম বড় পরিবেশ বিপর্যয় এখন কৃষ্ণসাগরকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে তুয়াপসের তেল শোধনাগার ও টার্মিনালগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর উপর্যুপরি ড্রোন হামলার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি কেবল একটি সামরিক পরাজয় নয়, বরং এটি পুতিন প্রশাসনের কয়েক দশকের ভ্রান্ত নীতি ও অবহেলার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এই বিপর্যয়ে তুয়াপসে থেকে শুরু করে জনপ্রিয় পর্যটন নগরী সোচি পর্যন্ত উপকূলরেখা আজ তেলের বিষাক্ত আস্তরণে ঢাকা পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আকাশে ‘কালো বৃষ্টি’ পড়ার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করছেন, যা মূলত পোড়া তেলের অবশেষ ও ধোঁয়া থেকে তৈরি হওয়া এক বিষাক্ত বর্ষণ। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এই অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এখনো ধুঁকছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে পরিবেশবিদরা চরম উদ্বিগ্ন।
রাশিয়ার এই দুর্যোগের মূলে রয়েছে তাদের যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতি এবং পরিবেশগত সুরক্ষাকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার দীর্ঘ ইতিহাস। পুতিন সরকার গত কয়েক বছর ধরে দেশটির পরিবেশ রক্ষা আইনগুলোকে শিথিল করেছে যাতে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তেল ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে কোনো বাধা না থাকে। রাশিয়ার অর্ধেকের বেশি আয় আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, আর এই বিশাল শিল্প অবকাঠামোটি আজ অরক্ষিত ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের হামলা এই ভঙ্গুর অবস্থাকে কেবল জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। রাশিয়ার পরিবেশবাদীদের মুখ বন্ধ করতে বছরের পর বছর ধরে তাদের ‘বিদেশি এজেন্ট’ বা ‘অবাঞ্ছিত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আজকের এই সংকটকালীন সময়ে যারা সত্যিকার অর্থে সামুদ্রিক প্রাণীদের বাঁচাতে বা সৈকত পরিষ্কার করতে এগিয়ে আসছেন, তাদেরও রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের সময় রুশ কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। স্বচ্ছতার পরিবর্তে তারা কেবল সত্যকে ধামাচাপা দিতেই ব্যস্ত ছিল। যেখানে তীরের পাথরগুলো এখনো তেলের পিচ্ছিল আস্তরণে ঢাকা এবং মৃত ডলফিন সৈকতে ভেসে আসছে, সেখানে স্থানীয় কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পর্যটন মৌসুম শুরু ও সৈকতগুলো খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ধরণের লুকোচুরি ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল বিপর্যয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখনো রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়েছিল। আজকের কৃষ্ণসাগর উপকূলেও সেই একই প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবীরা যখন সমুদ্রের পাখি বা প্রাণীদের পরিষ্কার করতে যাচ্ছে, তখন তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং সংবাদকর্মীদের তথ্য সংগ্রহের সময় হেনস্থা করা হচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, রাশিয়ার কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যেও জনমনে এর প্রতিক্রিয়া বেশ তীব্রভাবে ফুটে উঠছে। যদিও ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম দেশটিতে নিষিদ্ধ, তবুও মানুষ ভিপিএন ব্যবহার করে এই ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও তথ্য বিনিময় করছে। সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল ইউক্রেনকে দোষ দিয়ে বসে নেই; তারা বরং তাদের নিজেদের সরকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেন এই বিশাল অবকাঠামোটি রক্ষা করা গেল না এবং কেন বিপর্যয়ের পর দ্রুত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না—এমন প্রশ্ন এখন রাশিয়ার অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যখন যুদ্ধের নাম উচ্চারণ করাও দেশটিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তখন পরিবেশ বিপর্যয় যেন প্রতিবাদের একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সংঘাত কেবল সীমান্তের লড়াই নয়, এটি এখন রাশিয়ার ভেতরের সাধারণ মানুষের জীবন ও প্রকৃতির ওপর এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও এই ঘটনাটি এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার আগ্রাসনকে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশগত গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এখন ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় যখন এই বিশাল দূষণ ছড়াচ্ছে, তখন পশ্চিমা বিশ্বের একদল পরিবেশবাদী কিয়েভকেও কাঠগড়ায় তুলছেন। তবে আরশাক মাকিচিয়ানদের মতো রুশ-আর্মেনীয় জলবায়ু কর্মীদের মতে, দোষ কেবল কামানের গোলার নয়, দোষ সেই ব্যবস্থার যা পরিবেশকে তুচ্ছজ্ঞান করে যুদ্ধের হাতিয়ার বানিয়েছে। বৈকাল হ্রদ থেকে শুরু করে সুমেরু অঞ্চল—রাশিয়ার সর্বত্রই পরিবেশগত সুরক্ষাকে সরিয়ে দিয়ে কেবল সম্পদ নিংড়ানো বা ‘এক্সট্রাক্টিভিজম’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এই উপনিবেশিক ধাঁচের শাসন ব্যবস্থায় স্থানীয় জাতিসত্তা এবং তাদের ভূমির কোনো গুরুত্ব পুতিন প্রশাসনের কাছে নেই।
কৃষ্ণসাগর উপকূলের এই বিপর্যয় কেবল কয়েক হাজার টন তেলের ছড়িয়ে পড়া নয়, এটি একটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ। যে অঞ্চলে একসময় রুশ সাম্রাজ্য সার্কাসীয় জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল, আজ সেখানেই নিজেদের অব্যবস্থাপনায় তারা প্রকৃতির ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। রাশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড যা পৃথিবীর ১০ শতাংশ স্থলভাগ জুড়ে বিস্তৃত, সেখানে এখন একের পর এক পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে চলেছে যা বিশ্ববাসীর অগোচরে থেকে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দামামা হয়তো একদিন থামবে, কিন্তু কৃষ্ণসাগরের বিষাক্ত জলরাশি এবং এর মরে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লেগে যাবে। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা না নিলে কেবল রাশিয়া নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু ও পরিবেশ এক মহাবিপদের মুখে পড়বে।
