রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: মুসলিম সমাজের মূল দায়িত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৬, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ: মুসলিম সমাজের মূল দায়িত্ব

পবিত্র কুরআনে উম্মতে মুহাম্মাদির বিশেষ মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব ও অস্তিত্বের মূল ভিত্তি হিসেবে সমাজ সংস্কারের সামষ্টিক বৈশ্বিক দায়িত্বকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য এই উম্মতকে মনোনীত করে তাদের কাঁধে একটি বিশেষ ঐশ্বরিক ও সামাজিক দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এই মৌলিক দর্শনই ইসলামের পরিভাষায় সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ নামে সুপরিচিত, যা সমাজ থেকে অন্যায় ও জুলুমের অবসান ঘটিয়ে সাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

মুমিনদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য এই মৌলিক নীতিতে অবিচল থাকা প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, তোমরাই উত্তম উম্মত; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমরাই মনোনীত হয়েছ, তোমরা মানুষকে সৎকাজে অনুপ্রাণিত করবে এবং অসৎকাজে বাধা প্রদান করবে। এই আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনো সাময়িক রাজনৈতিক vote বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অর্জিত হয়নি, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক চিরন্তন ঐশ্বরিক সম্মান। তবে এই মর্যাদা ধরে রাখার প্রধান শর্ত হলো সমাজে ভালো কাজের প্রসার এবং মন্দ কাজের প্রতিরোধ একক ও সংঘবদ্ধ—উভয়ভাবেই সচল রাখা। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র মুমিন সমাজে এই সংস্কার কাজ সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা শক্তিশালী দল গঠন করার সরাসরি ফরজ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪)।

ইতিহাসের পাতা ও প্রাচীন নথির দিকে তাকালে দেখা যায়, পূর্ববর্তী উম্মতদের ধ্বংস এবং তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বা লানত আসার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের নীরবতা। বনি ইসরায়েলের অবাধ্য ও জালেম সম্প্রদায়ের ওপর দাউদ ও মরিয়মপুত্র ঈসা আলাইহিস সালামের মাধ্যমে যে অভিশাপ এসেছিল, তার মূল কারণ ছিল তারা পরস্পরকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার কোনো চেষ্টা করেনি (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:৭৮-৭৯)। ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসিরদের মতে, সমাজে কোনো স্পষ্ট অন্যায় দেখে চোখ বন্ধ করে চুপ থাকা কেবল সাধারণ কোনো পাপাচার বা কবিরাহ গুনাহ নয়, বরং এটি একটি পুরো প্রজন্মকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের চোরাবালিতে নিয়ে যায়। সমাজজুড়ে যখন নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশে যতই মসজিদ-মাদ্রাসা থাকুক কিংবা মানুষ নামাজ-রোজা বা হজ পালন করুক না কেন, ভেতরের নৈতিক পতন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই সামাজিক ও আদেশগত আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলেমসমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং জ্ঞানীদের সামাজিক দায়িত্ব অনেক বেশি বলে ইসলামি বিধানে কঠোরভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ সবসময় আলেমদের ধর্মীয় আদর্শ ও নৈতিকতা অনুসরণ করে এবং তারা দ্বীনের খুঁটি মজবুত রাখার ক্ষেত্রে সম্মুখসারির অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী আমলের ধর্মীয় পুরোহিত ও রাব্বানিদের তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন কারণ তারা সাধারণ মানুষকে জুলুম, দুর্নীতি ও হারাম ভক্ষণ থেকে বিরত রাখতে নিজেদের কণ্ঠস্বর সচল রাখেনি (সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:৬২-৬৩)। জ্ঞানীদের এই সুবিধাবাদী নীরবতা মূলত ঘুণপোকার মতো সমাজকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, যার ফলে তরুণ সমাজ অবক্ষয়ে ডুবে যায়, রাজনীতিবিদরা অসৎ জীবনে জড়িয়ে পড়েন এবং ব্যবসায়ীরা ওজনে কম দেওয়া বা ভেজাল দেওয়াকে মুনাফার একমাত্র উপায় বানিয়ে ফেলে।

যখন কোনো সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবাদ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, তখন যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক সংকটে পুরো জনপদ এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। মানুষ তখন একে অপরের প্রতি মায়া-মমতা দেখানোর পরিবর্তে অন্যের সংকট ও চরম বিপদ নিয়ে অনৈতিক মুনাফা লোটার ঘৃণ্য উৎস খোঁজে, যা একটি পচনশীল ও পাপাচারী সমাজের চূড়ান্ত লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। তাই ধর্মীয় দৃষ্টিতে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কোনো সাধারণ ঐচ্ছিক বা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায্যতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ টিকিয়ে রাখার প্রধান ঐশ্বরিক ফরজ বিধান।

banner
Link copied!