যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিশিগান হ্রদ তীরের একটি ছোট্ট শহর পোর্ট হোলকম্ব। এই কাল্পনিক শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ বা ‘সাপার ক্লাব’কে কেন্দ্র করে মাতৃত্ব, পরিবার এবং ঐতিহ্যের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা হয়েছে ক্লার সোয়াইনারস্কির নতুন উপন্যাস ‘দ্য সাপার ক্লাব সেন্টস’। লেখক সোয়াইনারস্কি তাঁর এই সপ্তম উপন্যাসে উইসকনসিনের গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং পারিবারিক বন্ধনের এক নিবিড় চিত্র তুলে ধরেছেন। যেখানে একটি রেস্তোরাঁ কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, বরং পুরো একটি সম্প্রদায়ের মিলনস্থলে পরিণত হয়। উপন্যাসটিতে লেখক মাতৃত্বের এমন কিছু দিক স্পর্শ করেছেন যা সাধারণত অজানাই থেকে যায়।
গল্পের প্রধান চরিত্র রেমি, যিনি ‘বাউমহাউস সাপার ক্লাব’ নামক রেস্তোরাঁটির কর্ণধার। স্বামী হারানোর শোক এবং বার্ধক্যের কারণে তিনি এখন রেস্তোরাঁটি বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন তাঁর সন্তানরা এই পারিবারিক ঐতিহ্য বহন করতে অনীহা প্রকাশ করে। সোয়াইনারস্কি তাঁর উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের ওপর নিজেদের স্বপ্ন চাপিয়ে দিতে চান, কিন্তু রেমি একজন সচেতন মা হিসেবে বুঝতে পারেন যে তাঁর সন্তানদের নিজস্ব স্বপ্ন ও পথ রয়েছে। ঐতিহ্যের মায়া ত্যাগ করা কঠিন হলেও তিনি স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎকে মেনে নেওয়ার সাহসিকতা দেখান।
উপন্যাসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রেমির মেয়ে ক্যাসের জীবন। ক্যাস প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন এবং এর থেকে মুক্তি পেতে তিনি ‘মম ইনফ্লুয়েন্সার’ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবশালী মায়েদের কাল্পনিক জগতে আশ্রয় খোঁজেন। এই বিষয়টি বর্তমান যুগের মায়েদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইন্টারনেটের চাকচিক্যময় জীবনের হাতছানি কীভাবে একজন মাকে নিজের পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে, লেখক তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্যাস যখন একটি ‘মমিউন’ বা মায়েদের বিশেষ অনলাইন কমিউনিটিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন রেমি বুঝতে পারেন যে একটি ভবন বা ব্যবসা কখনো পরিবারের বিকল্প হতে পারে না।
একই সাথে বইটিতে হিলারি নামের এক একক মায়ের সংগ্রামের চিত্রও ফুটে উঠেছে। হিলারি একজন শিল্পী এবং তিন সন্তানের মা। তিনি তাঁর ক্যারিয়ার এবং সন্তানদের লালন-পালনের মধ্যে যে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তাকে লেখক ‘অদৃশ্য শ্রম’ বা ইনভিজিবল লেবার হিসেবে অভিহিত করেছেন। সন্তানদের প্রতিটি ছোটখাটো প্রয়োজন মনে রাখা এবং এক হাতে সব সামলানোর এই অদৃশ্য বোঝা অনেক মায়ের জন্যই এক কঠিন বাস্তবতা। হিলারি ও ক্যাসের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন মাতৃত্বের বিভিন্ন জীবনবোধ ও পছন্দের ভিন্নতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
লেখক ক্লার সোয়াইনারস্কি নিজেই একজন উইসকনসিনবাসী। তিনি মনে করেন তাঁর বইয়ে উইসকনসিন কেবল একটি স্থান নয়, বরং একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থিত থাকে। মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় বা মিডওয়েস্টার্ন সংস্কৃতিতে পরিবার এবং খাবারের যে গুরুত্ব, তা তিনি সাপার ক্লাবের আবহে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে মানুষের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বরং সবাই মিলে শান্তিতে বসে ঐতিহ্যবাহী খাবার উপভোগ করে। উপন্যাসটি কেবল একটি গল্প নয়, বরং এটি মাতৃত্বের মর্যাদা এবং পারিবারিক শেকড়ের সন্ধানে এক নতুন পথ দেখায়। সোয়াইনারস্কির এই কাজ মার্কিন সাহিত্যে বিশেষ করে পারিবারিক মূল্যবোধের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
