মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

স্মার্টফোনের নেশা ও দাজ্জালি চক্রান্ত: আলেমদের বিশেষ হুঁশিয়ারি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ১১:৩১ পিএম

স্মার্টফোনের নেশা ও দাজ্জালি চক্রান্ত: আলেমদের বিশেষ হুঁশিয়ারি

ছবি - Ai

বর্তমান পৃথিবীর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তার বিশ্বজুড়ে মুসলিম চিন্তাবিদ ও গবেষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অতি-নির্ভরশীলতাকে অনেকে শেষ জামানার সেই ভয়ংকর ফিতনার প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখছেন। পবিত্র কোরআন এবং সহীহ হাদিসের নিবিড় গবেষণায় নিয়োজিত প্রবীণ আলেমদের মতে, আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে প্রতিটি মানুষের ঈমান এক সুক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েছে। এই ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দাজ্জালি শক্তি যা মানুষকে আধ্যাত্মিক জগত থেকে বিচ্যুত করে এক যান্ত্রিক দাসে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আল জাজিরা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ইসরায়েল, আমেরিকা এবং ইরানের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক ইসলামি স্কলার এই পরিস্থিতিকে হাদিসে বর্ণিত শেষ জামানার মহাযুদ্ধ বা ‍‍`আল-মালহামা আল-কুবরা‍‍`-র পূর্বলক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, এই যুদ্ধের ডামাডোলে দাজ্জালি শক্তিগুলো এক সর্বগ্রাসী প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে। এর অন্যতম রূপ হতে পারে মানুষের শরীরে মাইক্রোচিপ স্থাপনের মতো প্রক্রিয়া, যা মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকে চিরতরে হরণ করে নিতে পারে। যদিও এই বিষয়টি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে প্রযুক্তির বর্তমান গতিপ্রকৃতি এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তি যেভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে জেঁকে বসেছে, তার নাম কেন ‍‍`স্মার্টফোন‍‍` রাখা হয়েছে তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন প্রবীণ আলেম ও গবেষকগণ। তারা মনে করেন, যখন একটি জড় যন্ত্রকে ‍‍`স্মার্ট‍‍` বা বুদ্ধিমান বলা হয়, তখন পরোক্ষভাবে এর ব্যবহারকারী মানুষকে নির্বোধ বা বুদ্ধিহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি বাণিজ্যিক ও মানসিক প্রচেষ্টা কাজ করে। এটি মানুষের আল্লাহর দেওয়া স্বাভাবিক প্রজ্ঞা এবং ঈমানি দূরদর্শিতাকে কেড়ে নেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। মানুষ এখন নিজের বুদ্ধিকে কাজে না লাগিয়ে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে এই যান্ত্রিক স্ক্রিনের ওপর নির্ভর করছে, যা মূলত মানুষের বিবেককে ছিনতাই করার এক আধুনিক রূপ।

হাদিস শাস্ত্রের অন্যতম আধার মুসনাদে আহমাদ-এর একটি বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, শেষ জামানার মানুষের বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে পুরোপুরি ছিনতাই করে নেওয়া হবে। আজকের এই ডিজিটাল যুগে এসে সেই ভবিষ্যৎবাণীর এক ভয়াবহ বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানুষ এখন পবিত্র কোরআনের নূর বা আধ্যাত্মিক সমাধানের পরিবর্তে ইন্টারনেটের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিচ্ছে। এর ফলে মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি এবং ধর্মীয় গভীরতা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সর্বত্র এখন যান্ত্রিক নির্ভরতা এক পঙ্গু প্রজন্ম তৈরি করছে যারা যন্ত্র ছাড়া নিজের অস্তিত্ব কল্পনাও করতে পারে না।

চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় স্মার্টফোনের অতি-ব্যবহারের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব উঠে এসেছে। বিবিসি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য বিষয়ক সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্মার্টফোনের নীল আলো এবং এর সার্বক্ষণিক ব্যস্ততা মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে অস্থির করে তোলে। বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী এবং বিধ্বংসী। অনেক শিশু এখন শৈশব থেকেই মোবাইল ফোনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার ফলে তাদের বাকশক্তি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। যে বয়সে একটি শিশুর সামাজিক মেলামেশা এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করার কথা, সেই বয়সে সে এক যান্ত্রিক জগতের বাসিন্দা হয়ে নিজের মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলছে।

এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষকরা বলছেন যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও যদি মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য ফোনের স্ক্রিনে নিমগ্ন থাকে, তবে তার মস্তিষ্ক দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকে। এটি কোনো সাধারণ সমস্যা নয় বরং এটি একটি পরিকল্পিত মানসিক পঙ্গুত্ব। দাজ্জালের ফেতনা মোকাবিলা করার জন্য যে তীক্ষ্ণ মেধা এবং মজবুত ঈমান প্রয়োজন, প্রযুক্তির এই মরণফাঁদ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সেই যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত করছে। সূরা আল-আরাফ-এর ১৭৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমন লোকদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট বলেছেন যারা সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। বর্তমানের প্রযুক্তি-নির্ভর অন্ধ সমাজ সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখাচ্ছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং সতর্কতামূলক পূর্বাভাসটি হলো এই আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষণস্থায়ীত্ব। হাদিসের বিভিন্ন ইঙ্গিত থেকে ইসলামি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, আজ আমরা যে যান্ত্রিক সভ্যতা নিয়ে গর্ব করছি, তা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। হয়তো আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই পৃথিবী আবার সেই প্রাচীন অবস্থায় ফিরে যাবে যেখানে বিদ্যুৎ, দ্রুতগামী বিমান কিংবা স্মার্টফোনের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তখন মানুষের বেঁচে থাকার এবং যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন হবে ঘোড়া, উট কিংবা গাধার মতো চতুষ্পদ জন্তু। আজ যা আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, সময়ের বিবর্তনে তা-ই হয়তো রূঢ় বাস্তবতায় পরিণত হবে।

পৃথিবীর এই সম্ভাব্য আমূল পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে আলেম সমাজ এখন থেকেই মানুষকে কায়িক পরিশ্রম এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিচ্ছেন। বিলাসিতা ও যন্ত্র-নির্ভরতা ত্যাগ করে প্রকৃত ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার সময় এখনই। প্রযুক্তির দাজ্জালি জাল থেকে নিজের পরিবার এবং সন্তানদের রক্ষা করতে হলে আমাদের আবার মূল বই পড়ার অভ্যাস এবং প্রাকৃতিক জীবনযাপনে ফিরে যেতে হবে। অন্যথায় এই কৃত্রিম চাকচিক্যের আড়ালে আমরা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ—ঈমান ও মেধা—উভয়ই চিরতরে হারিয়ে ফেলব। সহীহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, শেষ জামানার ফেতনা হবে অত্যন্ত জটিল এবং অন্ধকার রাত্রির মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন, যা থেকে বাঁচতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা এবং সচেতনতা অপরিহার্য।

পরিশেষে বলা যায় যে, দাজ্জালের ফেতনা কেবল একটি চরিত্র নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার নাম হতে পারে যা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। আমাদের হাতের স্মার্টফোনটি আজ সেই ব্যবস্থারই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যেমন লঙ্ঘিত হচ্ছে, তেমনি আমাদের মেধা ও সময় পাচার হয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য শক্তির ডাটাবেজে। এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণ ত্যাগ করে কোরআন ও সুন্নাহর প্রদর্শিত পথে ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতা এবং আল্লাহর সাহায্যই হতে পারে এই কঠিন সময়ে আমাদের একমাত্র রক্ষাকবচ।

banner
Link copied!