সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

হাররানের যুদ্ধ ও রোমের পরাজয়: ঐতিহাসিক বার্তা বাঘাঈর

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

হাররানের যুদ্ধ ও রোমের পরাজয়: ঐতিহাসিক বার্তা বাঘাঈর

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাঈ বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বশক্তিগুলোকে ইতিহাসের শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, জবরদস্ত আগ্রাসনকারীদের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের দৃঢ় প্রতিরোধের ইতিহাস খোদ পারস্য সভ্যতার ইতিহাসের মতোই সুদীর্ঘ ও গৌরবময়। রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই মন্তব্য করেন। বাঘাঈর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে এবং ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ও সামরিক হুমকির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

ইসমাইল বাঘাঈ তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে, ইরানিরা ইতিহাসের প্রতিটি যুগে কেবল একটি নির্দিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধেই লড়াই করেনি, বরং নানা সাম্রাজ্য এবং তাদের সুসংগঠিত ‘লিজিয়ন’ বাহিনীর বিরুদ্ধেও অকুতোভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই দীর্ঘ পথচলায় ইরান সবসময় সম্মান ও গৌরবের সঙ্গেই বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছে। তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আধুনিক ইরানকে প্রাচীন পারস্যের সেই অপরাজেয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি মনে করেন, ইরানিদের আত্মরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মানসিকতা কোনো নতুন বিষয় নয়, বরং এটি তাদের হাজার বছরের ডিএনএ-তে মিশে আছে।

ঐতিহাসিক ঘটনার উদাহরণ টেনে বাঘাঈ খ্রিস্টপূর্ব ৫৩ সালের এই দিনের ‘হাররানের যুদ্ধের’ (Battle of Carrhae) কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে মহান ইরানি সেনাপতি সুরেনা অত্যন্ত স্বল্পসংখ্যক সৈন্য এবং সীমিত যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে রোমের সুসজ্জিত লিজিয়ন বাহিনীকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে রোমের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব ক্রাসাস নিহত হয়েছিলেন এবং রোমান সাম্রাজ্যের অপরাজেয়তার মিথ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। বাঘাঈর মতে, হাররানের যুদ্ধের সেই ফলাফল কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না, বরং তা ছিল পূর্ব দিকে রোম সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের স্বপ্নকে চিরতরে কবর দেওয়ার একটি সন্ধিক্ষণ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বর্তমান বিশ্ব নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন যে, যারা ইতিহাস পড়ে না এবং ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করে না, তাদের জন্য ইতিহাস নিজেকে বারবার পুনরাবৃত্তি করে। তাঁর এই হুঁশিয়ারি মূলত সেই সকল শক্তির উদ্দেশ্যে যারা ইরানকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করছে। তিনি প্রাচীন রোমের পরাজয়কে বর্তমানের আগ্রাসকদের জন্য একটি সতর্কবাণী হিসেবে দেখছেন। বাঘাঈর মতে, ইতিহাসের পাতায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে কোনো বিদেশি শক্তি যখনই পারস্যের মাটিতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে, তখনই তারা চরম পরাজয়ের স্বাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসমাইল বাঘাঈর এই ঐতিহাসিক বয়ান কেবল একটি সাধারণ স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি ইরানের বর্তমান প্রতিরক্ষামূলক ও কূটনৈতিক কৌশলের একটি অংশ। বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সামরিক সরঞ্জাম বা সংখ্যাধিক্য সবসময় বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, বরং দেশপ্রেম ও দীর্ঘ সভ্যতার লড়াকু মানসিকতা অনেক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। তেহরানের এই মুখপাত্রের বয়ান অনুযায়ী, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তারা যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রাচীন জেনারেল সুরেনার মতোই পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত।

banner
Link copied!