ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর-এর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নাটকীয় সিদ্ধান্তটি হয়তো দেখা গেল গত রবিবার লন্ডন স্টেডিয়ামে। আর্সেনাল ও ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের মধ্যকার ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ৪ মিনিট ১১ সেকেন্ডের এক রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা কেবল একটি ম্যাচের ফলাফলই নির্ধারণ করেনি, বরং এটি পুরো মৌসুমের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একদিকে আর্সেনাল দীর্ঘ ২২ বছর পর তাদের প্রথম লিগ শিরোপার পথে ৫ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে গেল, অন্যদিকে অবনমনের শঙ্কায় থাকা ওয়েস্ট হ্যামের জন্য দিনটি হয়ে দাঁড়াল চরম হতাশার।
ম্যাচের ৮৩ মিনিটে লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ডের গোলে আর্সেনাল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ইনজুরি সময়ের একেবারে শেষ দিকে ওয়েস্ট হ্যামের বদলি খেলোয়াড় ক্যালাম উইলসন জটলার ভেতর থেকে বল জালে পাঠালে পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। আর্সেনাল ম্যানেজার মিখেল আর্তেতা হতাশায় মাথা নিচু করে ফেলেছিলেন, ভেবেছিলেন শিরোপার রেসে মূল্যবান দুটি পয়েন্ট হাতছাড়া হতে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই শুরু হয় ভিএআর-এর চুলচেরা বিশ্লেষণ। আর্সেনাল দাবি করে যে তাদের গোলরক্ষক ডেভিড রায়াকে ফাউল করা হয়েছে। স্টকলি পার্কে থাকা ভিএআর কর্মকর্তা ড্যারেন ইংল্যান্ড দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিটি অ্যাঙ্গেল থেকে ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করেন।
প্রায় পৌনে তিন মিনিট ধরে ফুটেজ দেখার পর রেফারি ক্রিস কাভানাঘকে সাইডলাইন মনিটরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পুরো স্টেডিয়াম তখন নিস্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করছিল। অবশেষে রেফারি ঘোষণা করেন যে ওয়েস্ট হ্যামের খেলোয়াড় পাবলো আর্সেনাল গোলরক্ষককে বাধা দেওয়ায় গোলটি বাতিল করা হলো। এই একটি সিদ্ধান্ত আর্সেনালকে জয়ের স্বাদ দিলেও ওয়েস্ট হ্যামকে ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারায়। বর্তমানে আর্সেনাল ম্যানচেস্টার সিটির চেয়ে ৫ পয়েন্টে এগিয়ে থাকলেও তারা একটি ম্যাচ বেশি খেলেছে। অন্যদিকে ওয়েস্ট হ্যাম এখন টটেনহ্যামের চেয়ে এক পয়েন্ট পিছিয়ে থেকে অবনমন অঞ্চলের একদম কাছে অবস্থান করছে।
ম্যাচ শেষে দুই দলের ম্যানেজারের কণ্ঠে ছিল ভিন্ন সুর। আর্সেনাল বস আর্তেতা ম্যাচ অফিশিয়ালদের সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন যে এটি একটি কঠিন কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি মনে করেন গোলরক্ষক ডেভিড রায়ার হাত যেভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তাতে ফাউলের সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক। তবে ওয়েস্ট হ্যাম ম্যানেজার নুনো এস্পিরিতো সান্তো ছিলেন বিধ্বস্ত। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে সেট-পিস বা কর্নারের সময় ফাউলের মানদণ্ড নিয়ে এখন সবাই বিভ্রান্ত। খেলোয়াড়দের মাঠে যা মনে হয়েছে এবং ভিএআর যা দেখেছে তার মধ্যে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ওয়েস্ট হ্যামের ভক্ত ও খেলোয়াড়রা মনে করছেন তাদের কাছ থেকে একটি নিশ্চিত পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই ভিএআর সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ড্যারেন ইংল্যান্ড। মজার ব্যাপার হলো এই ড্যারেন ইংল্যান্ডই ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে লিভারপুলের লুইস দিয়াজের গোল ভুলভাবে বাতিল করে প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে বড় ভিএআর বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই ভুলের পর তাকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আবার শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বে ফিরতে হয়েছে। আগামী শনিবার এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটি বনাম চেলসি ম্যাচেও তিনি দায়িত্ব পালন করবেন। রবিবার তার নেওয়া এই সাহসী সিদ্ধান্তটি তাকে পুরনো গ্লানি থেকে মুক্তি দিলেও ইংলিশ ফুটবলের শিরোপা ও অবনমনের সমীকরণকে করে তুলেছে অনেক বেশি জটিল।
সব মিলিয়ে লন্ডন স্টেডিয়ামের সেই ৪ মিনিট ১১ সেকেন্ড কেবল সময়ের হিসাব ছিল না, এটি ছিল দুই ক্লাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত। আর্সেনালের জন্য এটি হয়তো তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা পেরোনোর গল্প হয়ে থাকবে। আর ওয়েস্ট হ্যামের জন্য এটি হয়তো চ্যাম্পিয়নশিপে নেমে যাওয়ার এক ট্র্যাজিক মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। ফুটবলের এই অনিশ্চয়তা আর প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলবে আরও অনেক দিন।
