বিয়ের পর একটি ছকবাঁধা জীবনের রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন অধিকাংশ পুরুষ। সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের দেখাশোনা আর প্রতিদিনের শৃঙ্খলার মাঝে নিজের জন্য একটু আলাদা সময় বা `পার্সোনাল স্পেস` খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই কারণেই যখন স্ত্রী কয়েক দিনের জন্য বাবার বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, তখন অনেক স্বামীর মধ্যেই এক ধরনের চাপা উচ্ছ্বাস বা হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতার আনন্দ লক্ষ্য করা যায়। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি দাম্পত্য কলহ বা ভালোবাসা কমে যাওয়ার লক্ষণ নয়, বরং এটি মানুষের চিরাচরিত ব্যক্তিগত সময় উপভোগ করার একটি সহজাত প্রবৃত্তি।
স্ত্রী বাড়িতে না থাকলে স্বামীদের এই খুশির প্রথম ও প্রধান কারণ হলো রুটিন থেকে মুক্তি। প্রতিদিন কখন বাড়ি ফিরতে হবে, কী বাজার আনতে হবে কিংবা খাওয়ার সময় কেন দেরি হলো—এই ছোট ছোট জবাবদিহিতাগুলো তখন সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। অনেক স্বামীই তখন নিজের পুরনো ব্যাচেলর জীবনের স্বাদ ফিরে পান। রাত জেগে ফুটবল খেলা দেখা, বিছানায় ইচ্ছেমতো এলোমেলো হয়ে শুয়ে থাকা কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া—এই ছোট ছোট কাজগুলো তখন তাদের কাছে অত্যন্ত উপভোগ্য মনে হয়।
সংসারের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে স্ত্রীদের শাসন অনেক সময় স্বামীদের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ভেজা তোয়ালে কোথায় রাখা হলো, বাইরে থেকে কেন ভাজাপোড়া কিনে খাওয়া হলো—এমন হাজারো শাসন থেকে কয়েক দিনের বিরতি স্বামীদের মনে মুক্তির আমেজ তৈরি করে। আরিফ নামের এক ব্যক্তি এই অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে রসিকতা করে বলেন, "বিয়ের অনেক বছর হয়ে গেলে সংসারটাকে মাঝে মাঝে কারাগার মনে হয়। তাই বউ বাবার বাড়ি গেলে নিজেকে স্বাধীন আর `সিঙ্গেল` ভেবে একটু শান্তি পাওয়া যায়।" তবে এই স্বাধীনতার আনন্দ প্রথম দুই-তিন দিন যতটা প্রবল থাকে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে তা ফিকে হতে শুরু করে।
বন্ধুমহলে সময় দেওয়ার সুযোগও এই সময়ে বেড়ে যায়। স্ত্রী বাসায় থাকলে অনেকেই বন্ধুদের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করতে পারেন না। কিন্তু বাসা ফাঁকা থাকলেই যেন বন্ধুমহলে অলিখিত ঘোষণা চলে যায় যে "আজ রাত আমাদের"। সাব্বির নামের এক যুবক জানান, বউ বাবার বাড়ি গেলে নিজের মতো থাকা যায়, কেউ খবরদারি করে না। তবে তিনি এও স্বীকার করেন যে ঘরে ফিরলে এক ধরনের শূন্যতাও টের পাওয়া যায়। কারণ বহুদিনের অভ্যাসের ফলে স্ত্রীর অনুপস্থিতি ঘরটাকে অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ করে তোলে।
অন্যদিকে, সব স্বামীর ভাগ্য আবার এমন `স্বাধীনতার` স্বাদ পাওয়ার মতো হয় না। মন্ডল নামের এক ব্যক্তি জানান, তার স্ত্রী তাকে একা রেখে কখনও বাবার বাড়ি যান না, ফলে তিনি এই মুক্তির স্বাদ এখনও পাননি। আবার কেএইচ আর রাব্বী জানান তার তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, তার স্ত্রী তাকে সন্দেহ করেন এবং নিজের মতো সময় কাটাতে কুয়াকাটা গেলেও হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। অনেক স্ত্রীর ধারণা, স্বামী একা থাকলে বা আড্ডা দিলে সংসার রসাতলে যাবে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই সাময়িক দূরত্ব আসলে সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। দীর্ঘদিন একসাথে থাকতে থাকতে অনেক সময় একঘেয়েমি চলে আসে। স্ত্রী যখন বাবার বাড়ি যান, তখন স্বামীরা শুরুতে খুশি হলেও কয়েক দিন পর ঠিকই স্ত্রীর গুরুত্ব অনুভব করতে শুরু করেন। খাবার টেবিলে কেউ ডাকছে না, ঘর এলোমেলো পড়ে আছে কিংবা রাতে কথা বলার কেউ নেই—এই অভাবগুলোই বুঝিয়ে দেয় জীবনসঙ্গী জীবনে কতটা অপরিহার্য। তাই স্বামীদের এই সাময়িক খুশি আসলে ভালোবাসারই একটি ভিন্ন রূপ, যা শেষ পর্যন্ত একে অপরের প্রতি টান আরও বাড়িয়ে দেয়।
