"পা-পা-পা-পা-পা!" গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছিল এক অদ্ভুত শব্দ। উত্তর ইউক্রেনের পরিত্যক্ত এবং তেজস্ক্রিয়তায় ঘেরা চেরনোবিলের জনমানবহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে শব্দটির উৎস খুঁজছিলেন বিজ্ঞানী পাভলো বুরাকো। অন্ধকার বনের ভেতর তার হেড টর্চের আলো পড়তেই দেখা মিলল একটি ছোট্ট গাছের ব্যাঙের। মাত্র ৫ সেন্টিমিটার লম্বা এই উভচর প্রাণীটি তার সঙ্গীকে ডাকার জন্য তখন ব্যস্ত। কিন্তু ব্যাঙটিকে হাতে নিতেই চমকে উঠলেন স্প্যানিশ ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের এই বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী। সাধারণত এই প্রজাতির ব্যাঙ উজ্জ্বল সবুজ রঙের হলেও, চেরনোবিলের এই বাসিন্দা ছিল কুচকুচে কালো।
আজ চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ভোরে ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরের সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পারমাণবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত। বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় ধুলোবালি ছড়িয়ে পড়েছিল হাজার হাজার মাইল দূরে, যা এমনকি নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্য পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উত্তর ইউক্রেনের এই অঞ্চলটি। মানুষ জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল, কিন্তু ফেলে রেখে গিয়েছিল অগণিত বন্যপ্রাণী ও গাছপালাকে। চার দশক পর আজ প্রশ্ন উঠেছে—সেই ভয়ংকর বিষ কি চেরনোবিলের প্রাণীদের বদলে দিয়েছে? পাভলো বুরাকো এবং তার দলের গবেষণা বলছে, উত্তরটি হ্যাঁ, তবে তা আমরা যতটা নাটকীয় ভাবি ঠিক ততটা নয়।
পাভলো বুরাকো যখন ২০১৬ সালে প্রথম চেরনোবিলের এক্সক্লুশন জোনে পা রাখেন, তখন থেকেই তিনি একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিলেন—অভিযোজন। ২০২২ সালে প্রকাশিত তাদের একটি গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে যে, এক্সক্লুশন জোনের ভেতরে বসবাসকারী গাছের ব্যাঙগুলো বাইরের অঞ্চলের ব্যাঙের তুলনায় গড়ে অনেক বেশি গাঢ় রঙের। বিজ্ঞানীদের হাইপোথিসিস হলো, এই ব্যাঙগুলোর শরীরে মেলানিনের উচ্চ উপস্থিতি তাদের তেজস্ক্রিয়তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য একটি বর্ম হিসেবে কাজ করেছে। এটি বিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ হতে পারে, যেখানে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে প্রাণীরা নিজেদের শারীরিক গঠন বদলে ফেলেছে।
তবে এই তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্কও কম নয়। দক্ষিণ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী টিমোথি মুসো এই গবেষণার সমালোচনা করে বলেছেন যে, কেবল ব্যাঙের গায়ের রঙের পরিবর্তন তেজস্ক্রিয়তার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা নিয়ে আরও বিস্তারিত প্রমাণের প্রয়োজন। মুসো গত কয়েক দশক ধরে চেরনোবিলের বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এবং তার দল সেখানে অনেক বিকৃত ও অদ্ভুত দর্শন গাছ, টিউমারে আক্রান্ত পাখি এবং রিয়্যাক্টরের ভেতরে জন্ম নেওয়া এক ধরনের অদ্ভুত কালো ছত্রাকের সন্ধান পেয়েছেন। মুসোর মতে, অনেক প্রাণীই এখানে টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ডিএনএ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চেরনোবিলের রহস্যময় জগত কেবল ব্যাঙ বা পাখিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই পরিত্যক্ত জনপদে এখন দাপিয়ে বেড়ায় বন্য কুকুরদের দল। এগুলো মূলত বিপর্যয়ের সময় ফেলে যাওয়া গৃহপালিত কুকুরের বংশধর। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াই তারা এই তেজস্ক্রিয় পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শিখে নিয়েছে। সম্প্রতি গবেষকরা এই কুকুরদের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এদের ডিএনএ বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের কুকুরের তুলনায় আলাদা। তবে এই পরিবর্তন কি কেবল তেজস্ক্রিয়তার কারণে, নাকি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন জীবন ও বন্য অভ্যাসের ফল, তা এখনো গবেষণার বিষয়।
একটি বড় প্রশ্ন হলো, চেরনোবিলে যদি এতই বিষ থাকে, তবে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা কেন বাড়ছে? চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোন এখন ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন দেখা মেলে বিরল প্রজাপতির, ঘোড়া, নেকড়ে এবং ভালুকের। অনেক পরিবেশবিদ মনে করেন, পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও বন্যপ্রাণীদের জন্য বড় শত্রু ছিল `মানুষ`। মানুষের অনুপস্থিতি এই অঞ্চলে এক ধরনের জৈবিক ভারসাম্য ফিরিয়ে এনেছে। কৃষি কাজ, শিল্পায়ন এবং শিকার বন্ধ হওয়ায় তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রাণীরা এখানে বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পেয়েছে।
ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওবায়োলজিস্ট কারমেল মাদারসিল মনে করেন, চেরনোবিলের প্রকৃতি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিচ্ছে। তিনি বলেন, জীবন অত্যন্ত নমনীয়। তেজস্ক্রিয়তার মতো বড় বিপর্যয়ও জীবনকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারে না। তবে এই টিকে থাকার অর্থ এই নয় যে প্রাণীরা সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। হয়তো তারা এমন এক ধরনের জেনেটিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যার ফলাফল আমরা আগামী ১০০ বছর পর দেখতে পাব। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী রেডিয়েশন কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো শঙ্কিত।
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে গত কয়েক বছরে চেরনোবিলে বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতি কিছুটা থমকে গিয়েছিল। তবে ৪০তম বার্ষিকীতে এসে নতুন করে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে এই রহস্যময় অঞ্চল। পাভলো বুরাকো এবং তার সহকর্মীরা এখনো বিশ্বাস করেন যে, চেরনোবিল হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবন্ত গবেষণাগার। এখানে প্রতিটি প্রাণীর বেঁচে থাকা আমাদের শেখায় কীভাবে চরম প্রতিকূলতায় জীবন নিজের পথ খুঁজে নেয়। চেরনোবিলের কালো ব্যাঙ বা বন্য কুকুরগুলো কেবল একটি বিপর্যয়ের সাক্ষী নয়, তারা ভবিষ্যতের এক বিবর্তিত পৃথিবীর আগাম বার্তাবাহক।
পরিশেষে, চেরনোবিলের বর্তমান অবস্থা একটি প্যারাডক্স বা স্ববিরোধী গল্পের মতো। এটি একই সাথে মৃত্যুর ভূমি এবং জীবনের নতুন স্পন্দন। বিস্ফোরণের সেই বিভীষিকা আজও রিয়্যাক্টরের কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে আছে, কিন্তু তার চারপাশের বনাঞ্চল ডালপালা মেলেছে এক নতুন দিগন্তে। বিষাক্ত এই ভূমিতে বন্যপ্রাণীর বেঁচে থাকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি বিপর্যয় প্রকৃতিকে সাময়িকভাবে আহত করলেও, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই সব ক্ষত মুছে নিজের মতো করে ফিরে আসে। (সূরা আর-রুম, ৩০:৪১) আয়াতে বলা হয়েছে মানুষের কৃতকর্মের ফলে জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু চেরনোবিল আমাদের দেখাচ্ছে যে মানুষ যখন কোনো জায়গা ছেড়ে যায়, প্রকৃতি সেখানে আবার নিজের শাসন কায়েম করে। চেরনোবিলের বন্যপ্রাণী তাই কেবল টিকে থাকা নয়, বরং এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে আমাদের ইশারা দিচ্ছে।
