ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের আজ ৭২তম দিন। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও রোববার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের ১০টিরও বেশি শহরে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান থেকে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। সাকসাকিয়েহ এবং হারত সাইদা এলাকায় হামলায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি স্থায়ী শান্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তখন লেবাননের এই নতুন রক্তপাত যুদ্ধবিরতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে, হোয়াইট হাউস বর্তমানে তেহরানের উত্তরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের কাছে একটি ১৪ দফার শান্তি প্রস্তাব পেশ করে। এই প্রস্তাবের মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানকে অন্তত ১২ বছরের জন্য তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। বিনিময়ে কয়েক দশকের পুরনো নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। যদিও তেহরান জানিয়েছে তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে, তবে রোববার পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর আসেনি।
পারস্য উপসাগরের পরিস্থিতিও বর্তমানে অত্যন্ত উত্তপ্ত। কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো সম্প্রতি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। কাতার জানিয়েছে যে তাদের জলসীমায় একটি মালবাহী জাহাজে ড্রোন আঘাত হেনেছে, যার ফলে জাহাজে আগুন ধরে যায়। অন্যদিকে আমিরাত দাবি করেছে তারা দুটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করেছে, তবে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ইরানের কোনো জাহাজে হামলা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ‘ভয়াবহ হামলা’ চালাবে। ইরানের সংসদীয় কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি জানিয়েছেন যে তেহরানের ধৈর্যের বাঁধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও এই যুদ্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট ‘আসিয়ান’ বর্তমানে ফিলিপাইনে একটি জরুরি শীর্ষ সম্মেলন করছে। আসিয়ান নেতারা একটি আঞ্চলিক জ্বালানি ভাগাভাগি কাঠামোর বিষয়ে একমত হলেও তা বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ বলে স্বীকার করেছেন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জানিয়েছেন যে এই নজিরবিহীন সংকট মোকাবিলায় তাদের কাছে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। গাজায় ইসরায়েলি অভিযানে নিহত হয়েছেন ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি এবং তেহরানের নীরবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে শান্তি আলোচনা এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি মার্কিন প্রস্তাবের কিছু শর্ত পরিবর্তন করতে চায় তবে আলোচনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের সিদ্ধান্তের দিকে, যা নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি আসবে নাকি আবারও বড় ধরনের সংঘাত শুরু হবে।
