সারা বিশ্বে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালনের যে দাবি বা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেটিকে ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক—উভয় মানদণ্ডেই ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। আজ শনিবার ৯ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে ইসলামী শরীয়তের মৌলিক বিধান অনুযায়ী চন্দ্রমাস গণনার ভিত্তি হচ্ছে চাক্ষুষ চাঁদ দেখা অথবা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য গ্রহণ। এই প্রাকৃতিক ও শরয়ী পদ্ধতি বাদ দিয়ে কেবল বৈশ্বিক ঐক্যের নামে একদিনে ঈদ পালনের ধারণাটি গ্রহণযোগ্য নয়।
খতিব মুফতি আবদুল মালেক তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে অমাবস্যা বা জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্বনির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে রোজা বা ঈদ পালন করা শরীয়তের সুপ্রতিষ্ঠিত বিধানে হস্তক্ষেপের নামান্তর। তার মতে মুসলমানদের জন্য ঈদ কেবলমাত্র একটি সামাজিক উৎসব বা আনন্দের উপলক্ষ নয় বরং এটি একটি উচ্চতর ইবাদত। যেহেতু এটি ইবাদতের অংশ তাই এর সময় নির্ধারণে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে যদি কোনো এলাকায় চাঁদ দেখা না যায় তবে নিয়ম অনুযায়ী শাবান বা রমজান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করতে হবে। এটিই ইসলামের চিরায়ত ও নিরাপদ বিধান যা দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম উম্মাহ অনুসরণ করে আসছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মুফতি আবদুল মালেক বলেন যে আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে রোজা ও ঈদ পালিত হয়ে আসছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজ এবং সাধারণ মানুষ এই পদ্ধতির প্রতি আস্থাশীল। এই স্থিতিশীল ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে জোরপূর্বক একদিনে ঈদ পালনের কোনো চেষ্টা করা হলে তা সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন যে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও সময়ের পার্থক্য একটি বাস্তব বিষয় যা বিজ্ঞান দ্বারাও স্বীকৃত। ফলে এক অঞ্চলের চাঁদ দেখা অন্য অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিক যুক্তিতেও টেকে না।
সেমিনারটি সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট আলেম মুফতি মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শীর্ষস্থানীয় আলেম, ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা খতিবের বক্তব্যের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বলেন যে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই ধর্মীয় উৎসবগুলো পালন করা উচিত। তারা মনে করেন যে বৈশ্বিক ঐক্যের চেয়ে শরীয়তের বিধান রক্ষা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেমিনারে উপস্থিত গবেষকরা উল্লেখ করেন যে প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে তবে তা যেন কোনোভাবেই মূল বিধানকে পাশ কাটিয়ে না যায়।
ইসলামি আইন বা ফিকহ শাস্ত্রের বিভিন্ন দলিলের উদ্ধৃতি দিয়ে মুফতি আবদুল মালেক তার দীর্ঘ বক্তব্যে আলেমদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলামের এই পদ্ধতিগুলোর যৌক্তিকতা সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে যাতে তারা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় প্রলুব্ধ না হয়। সেমিনার শেষে উপস্থিত আলেমদের পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত ঐকমত্যের আভাস পাওয়া যায় যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদ দেখা পদ্ধতিকেই সর্বোত্তম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই আলোচনাটি দেশের ইসলামি অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে কারণ আসন্ন উৎসবগুলোর সময় নির্ধারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়ই বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দেয়।
