দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করার স্মরণে রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক উৎসব ‘বিজয় দিবস’ আজ শনিবার মস্কোর রেড স্কয়ারে পালিত হয়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে এবারের এই উদযাপনে ছিল ভিন্ন এক চিত্র। গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র বা ভারী যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াই রেড স্কয়ারে সামরিক প্যারেড অনুষ্ঠিত হলো। নিরাপত্তা শঙ্কা এবং ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার হুমকির মুখে পুতিন সরকার এবারের আয়োজনকে ব্যাপকভাবে সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় রুশ পতাকা নিয়ে সামরিক ফরমেশনের মাধ্যমে এই কুচকাওয়াজ শুরু হয়।
এবারের বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপটকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা। শুক্রবার ট্রাম্প জানান যে রাশিয়ার অনুরোধে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তিন দিনের একটি যুদ্ধবিরতি এবং বন্দি বিনিময়ের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প এই বিরতিকে যুদ্ধের সমাপ্তির শুরু বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই রেড স্কয়ারে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা ঠেকাতে মস্কোর মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্যারেডের প্রথাগত রীতি অনুযায়ী এবার কেবল যুদ্ধবিমানের ফ্লাইওভার বা আকাশপথে মহড়া দেখা গেছে। পুতিন তার ভাষণে দেশটির সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরলেও ভারী অস্ত্রের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর আগে মস্কোর এই নিরাপত্তাহীনতাকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন যে রুশ কর্তৃপক্ষ রেড স্কয়ারের ওপর ড্রোন ওড়ার ভয়ে আতঙ্কিত। জেলেনস্কি এক আদেশে উপহাস করে শনিবার রেড স্কয়ারে ইউক্রেনীয় হামলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন যা পেসকভ একটি ‘বাজে রসিকতা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে রাশিয়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে শনিবারের উৎসবে ইউক্রেন কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করলে কিয়েভের কেন্দ্রে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে।
বিজয় দিবস বা ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’ রাশিয়ার জাতীয় সংহতির এক অনন্য প্রতীক। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্তত ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষকে হারিয়েছে। সেই বিশাল আত্মত্যাগ রুশ জনগণের মনস্তত্ত্বে এক গভীর দাগ কেটে আছে। বর্তমান সময়ে পুতিন এই দিবসটিকে নিয়মিতভাবে দেশের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে আসলেও এবারের আড়ম্বরহীনতা রাশিয়ার কৌশলগত পরিস্থিতির এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। কেবল মস্কো নয়, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের মতো সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতেও এই দিবসটি শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি চললেও সীমান্তের উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্থায়ী রূপ নেবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে মস্কোর রেড স্কয়ারে আজ কোনো ভারী অস্ত্রের গর্জন ছিল না, ছিল কেবল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা এক নিরব উৎসব। পুতিন তার দীর্ঘ শাসনামলে বিজয় দিবসকে যেভাবে দেশপ্রেমের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলেছেন তা এবারের এই ‘ডাউনসাইজড’ প্যারেডের মাধ্যমে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। বিশ্ববাসীর নজর এখন ট্রাম্পের ঘোষিত সেই যুদ্ধবিরতির পরবর্তী দিনগুলোর ওপর যেখানে শান্তি ফেরার সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।
