মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অঙ্গ হলো কিডনি যা প্রতিদিন নিরলসভাবে রক্ত পরিশোধন, শরীরের অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য অপসারণ এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো কিডনি যখন ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তখন শুরুর দিকে শরীরে খুব একটা স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয় কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণগুলো এমন সময় প্রকাশ পায় যখন কিডনির একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি। তাই শরীরের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো খেয়াল করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা এড়ানোর একমাত্র উপায়।
চিকিৎসকদের মতে কিডনি রোগের কিছু প্রাথমিক উপসর্গ এতটাই সাধারণ যে অনেকেই সেগুলোকে সাধারণ ক্লান্তি বা বয়সজনিত সমস্যা ভেবে ভুল করেন। প্রথমত শরীরের পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কিডনি যখন তার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে তখন শরীরে সোডিয়াম ও অতিরিক্ত তরল জমতে শুরু করে যার ফলে পায়ের পাতা ও গোড়ালিতে ফোলাভাব দেখা দেয়। একই সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসাও বিপদের লক্ষণ হতে পারে। যদি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রস্রাব অনেক কমে যায় তবে বুঝতে হবে কিডনি তার ফিল্টারিং সক্ষমতা হারাচ্ছে। কয়েক দিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললে বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিডনির সমস্যার অন্যতম নীরব লক্ষণ হলো অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা। কিডনি যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় কারণ এটি লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্যকারী হরমোন উৎপাদন করতে পারে না। ফলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও মানুষ দুর্বলতা ও অবসাদ অনুভব করে। এর পাশাপাশি হজমে সমস্যা, বমি বমি ভাব বা খাবারে তীব্র অনীহা তৈরি হতে পারে। শরীরে বর্জ্য পদার্থ বা বিষাক্ত টক্সিন জমে গেলে তা পরিপাকতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে যা দীর্ঘ মেয়াদে শরীরের ওজন কমিয়ে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলে।
উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। যদি কারো রক্তচাপ হঠাৎ করেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনেও তা না কমে তবে বুঝতে হবে কিডনির কার্যকারিতায় সমস্যা থাকতে পারে। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটি আর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না যা হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেলে অনেক সময় বুক ধড়ফড় করা বা হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক বা স্নায়ুবিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে যাকে চিকিৎসকরা ‘ব্রেন ফগ’ বলেন। শরীরে ইউরিয়ার মাত্রা বেড়ে গেলে মনোযোগের ঘাটতি বা মাথা ঝাপসা লাগার মতো সমস্যা তৈরি হয় যা দৈনন্দিন কাজকে কঠিন করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী যাদের পরিবারে কিডনি রোগের ইতিহাস রয়েছে কিংবা যারা নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করেন তাদের সতর্ক থাকা জরুরি। বছরে অন্তত একবার রক্তে ক্রিয়েটিনিন এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করলে কিডনির অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। পর্যাপ্ত পানি পান করা, লবণ কম খাওয়া এবং ধূমপান বর্জন করার মাধ্যমে কিডনিকে সুস্থ রাখা সম্ভব। মনে রাখতে হবে সচেতনতা ও সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণই পারে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে অকেজো হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে। শরীরের ছোটখাটো সংকেতগুলোকে অবহেলা না করে বরং সেগুলোর কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
