উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষক আফিফা রহমান নাইমা। তিনি বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় আরবানা–শ্যাম্পেইনে পিএইচডি গবেষণারত অবস্থায় গত শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিকট আত্মীয় ও সহকর্মীরা এই হৃদয়বিদারক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আফিফার এই অকাল মৃত্যুতে দেশ-বিদেশের শিক্ষাঙ্গনে এবং তার সহকর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে আফিফা রহমান নাইমা দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় গুরুতর শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হন। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা তার জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন করেন। তবে গত কয়েকদিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে শুক্রবার ভেন্টিলেশন খুলে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। তার অকাল প্রস্থানে দুই অবুঝ শিশু মাতৃহারা হলো যার মধ্যে বড় সন্তানটির বয়স মাত্র দেড় বছর।
আফিফার অকাল মৃত্যুতে তার সহকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করছেন। বুয়েটের সাবেক শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম তার এক পোস্টে লিখেছেন যে আফিফা পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের অত্যন্ত উজ্জ্বল একজন ছাত্রী ও শিক্ষক ছিলেন। আরবানা-শ্যাম্পেইনে পিএইচডি করতে গিয়ে এমন অকাল মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। তার মৃত্যুতে কেবল একটি পরিবার নয় বরং বাংলাদেশ একজন অমিত সম্ভাবনাময়ী গবেষককে হারালো। সহকর্মীরা তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং তার স্বামী ও সন্তানদের জন্য ধৈর্যের প্রার্থনা জানিয়েছেন।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণারত তার বন্ধু ও প্রতিবেশী শিব্বির আহমেদ জানিয়েছেন যে আফিফা এবং তার স্বামী মো. ইফতেখার ইসলাম সাকিব দুজনেই বুয়েটের শিক্ষক এবং ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছিলেন। গত চার বছরের অনেক স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান গত কয়েকদিন ধরে আফিফার বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছিল। চিকিৎসকরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করলেও জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এই মেধাবী দম্পতির দুই শিশু সন্তান এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে তারা তাদের মাকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছে।
আফিফা রহমান নাইমার পরিচিতজনরা তাকে একজন পরোপকারী, নম্র ও অত্যন্ত মেধাবী মানুষ হিসেবে স্মরণ করছেন। ইসলামের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করায় অনেকে তাকে ‘শহীদী মৃত্যু’র মর্যাদা দিয়ে দোয়া করছেন। বুয়েটের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ এবং ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়-এর বাংলাদেশি কমিউনিটি তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা বা জানাজার বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একজন মেধাবী শিক্ষকের এমন বিদায় আবারও প্রমাণ করে দিল যে জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং ক্ষণস্থায়ী।
