বিশ্বের হাজার হাজার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত জনপ্রিয় একাডেমিক সফটওয়্যার ক্যানভাস (Canvas) ভয়াবহ এক সাইবার হামলার শিকার হয়েছে। কুখ্যাত হ্যাকিং গ্রুপ ‘শাইনি-হান্টার্স’ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় তৈরি করেছে। সেমিস্টার বা বছরের শেষ সময়ে যখন শিক্ষার্থীরা চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠিক তখনই এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রাট কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ভুক্তভোগী অন্তত ৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইন পোর্টালগুলোতে এখন হ্যাকারদের মুক্তিপণ বার্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই ঘটনার পরপরই তাদের শুক্রবারের চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলো স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী অব্রে পামার বিবিসিকে জানিয়েছেন যে তিনি যখন তার ২ হাজার ৯০০ শব্দের একটি পরীক্ষার প্রবন্ধ শেষ করেছিলেন ঠিক তখনই তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে হঠাৎ একটি মুক্তিপণ বার্তা ভেসে ওঠে। সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল যে শাইনি-হান্টার্স আবারো ক্যানভাস বা ইনস্ট্রাকচার সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। হ্যাকাররা দাবি করেছে যে যদি ক্যানভাস কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিটকয়েনের মাধ্যমে মুক্তিপণ পরিশোধ না করে তবে তারা চুরি করা সব তথ্য ইন্টারনেটে ফাঁস করে দেবে।
এই হ্যাকিং কেবল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়নি বরং তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের পোর্টালে লগ-ইন না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে বিশ্বজুড়ে ক্যানভাস ব্যবহারকারী প্রায় ৯ হাজার প্রতিষ্ঠান এই বিপর্যয়ের শিকার এবং তারা ইনস্ট্রাকচার কোম্পানির কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়াও তাদের শিক্ষার্থীদের অবিলম্বে সফটওয়্যার থেকে লগ-আউট করার পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস অ্যাঞ্জেলেস বা ইউসিএলএ-তে অনেক শিক্ষার্থী তাদের অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন কারণ পুরো প্ল্যাটফর্মটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ইনস্ট্রাকচার গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি আপডেট দিয়ে জানিয়েছে যে ক্যানভাস এখন অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য সচল রয়েছে। তবে শুক্রবার সকালেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে তাদের সিস্টেমে এখনো বিভ্রাট রয়ে গেছে। পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি তাদের শিক্ষার্থীদের জানিয়েছে যে সমস্যার পূর্ণ সমাধান পেতে আরও ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লাগতে পারে। হ্যাকারদের এই হামলা কেবল একটি কারিগরি ত্রুটি নয় বরং এটি বিশ্বের ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে আবারো সবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের হামলা বর্তমানে অপরাধীদের কাছে একটি লাভজনক পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ এখানে শিক্ষার্থীদের বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ও একাডেমিক ডেটা থাকে। শাইনি-হান্টার্স গ্রুপটি এর আগেও বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে আলোচনায় এসেছিল। এবারের এই ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন যে তারা তাদের কষ্ট করে করা অ্যাসাইনমেন্ট বা পরীক্ষার খাতা সেভ হয়েছে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। অনেক শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে বছরের শেষ সময়ে এই ধরনের হামলা তাদের মানসিক চাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। পুলিশ ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বর্তমানে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে তবে এখনো পর্যন্ত বিটকয়েন মুক্তিপণ পরিশোধের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
